।। কিছু বলতে চাই ।।

0
332
শংকর মৈত্র

শংকর মৈত্র: এক লাখ টাকা খরচ করে নাটক বানিয়ে তিন লাখ টাকা লাভ করতে চাইবেন, বস্তাপচা সংলাপ, নাটকের থাকেনা আগামাথা, নেই কোনো মেসেজ, অভিনয়ের নামে ভাঁড়ামি এসব মানুষ দেখবে কেনো? মানুষ কি এতোই বোকা এ বিশ্বায়নের যুগে?

১০ হাজার টাকা দিয়ে ৩০ বছর আগের সিনেমা কিনে ১ লাখ টাকার বিজ্ঞাপন পেয়ে তিন ঘন্টা ধরে কেটে কেটে দিনে দুবার দেখাবেন, আবার বলবেন আপনি অনুষ্ঠান প্রচার করছেন। মানুষকে এতো বোকা ভাবেন কেনো?

এই সিনেমা, বস্তাপচা নাটক বাজারের চায়ের স্টলে চা পান খেয়ে খেয়ে একটা শ্রেণির দর্শক দেখে। আপনি যদি মনে করেন তারাই আপনার প্রকৃত দর্শক,তাদের বাজার ধরবেন তা হলে আমার কিছু বলার নেই। তবে আপনার টেলিভিশন রুচিশীল দর্শকের ঘরে টিউন হবে না। আপনার রুচিও টঙ দোকানদারের মতোই এবং, বুকটা ফাইট্টা যায় ‘মার্কা গানের স্রোতা আপনি। আপনার দ্বারা রুচিশীল কিছু হবে না।

গত কয়েকবছরে বাংলাদেশের টিভিগুলোতে খবর আর টকশো ছাড়া এমন একটা অনুষ্ঠানের নাম বলুনতো যা আপনি মনে রাখতে পেরেছেন? অথবা আপনি আগ্রহ নিয়ে দেখেছেন? সেই কবে এনটিভিতে ক্লোজআপ ওয়ান হয়েছিলো। দেশের মানুষ এখনো সেটাই মনে রেখেছে। এ মানের অনুষ্ঠান কি আর হয়েছে? আমি নিজেওতো একজন দর্শক। এখনো মনে আছে ক্লোজআপ ওয়ান দেখার জন্য শাহবাগের আড্ডা ফেলে বাসায় চলে আসতাম। তখন কয়েক বন্ধু মিলে ব্যচেলর বাসায় থাকতাম। ক্লোজআপ ওয়ানের শিল্পীদের গান শুনার জন্য সবাই মিলে চাঁদা তুলে টিভি কিনেছিলাম।

এখনো বিউটি, নোলক, সালমা, নিশিতার ছবি চোখে ভাসে। আমরা কেনো এতোদিন তাদের মনে রেখেছি? নিশ্চয় আমাদের মস্তিস্কে এখনো সেটা স্মৃতি হয়ে আছে। এর পর আর এমন অনুষ্ঠান হলোনা কেনো?

আপনি ১২ বছরের বাচ্চাকে দিয়ে, ‘আমি হৃদয়ের কথা বলিতে ব্যাকুল’ কিংবা ‘দুই ভূবনের দুই বাসিন্দা বন্ধু চিরকাল’, ‘প্রেম একবার এসেছিল নীরবে ‘ এমন পাকনামি গান গাওয়াবেন আর ভাববেন দর্শক মাত করে দিয়েছেন তা কিন্তু ভুল। আপনার পরিমিতিবোধের সমস্যার কারণে অনুষ্ঠান কিন্তু জনপ্রিয় হয় না।

ছবি: সংগৃহীত

আপনি পাশের দেশের টিভির রিয়ালিটি শো’র অনুকরণে অনুষ্ঠান করতে চান, কিন্তু গবেষণা করবেন না, টাকা খরচ করবেন না, তিন ফিট সেট বানিয়ে রিয়ালিটি শো করবেন আপনার অনুষ্ঠান মানসম্পন্ন হবে কেমনে? আপনার অনুষ্ঠান দর্শককে বিনোদন দেয়াতো দূরের কথা টিভি বন্ধ করে গালাগাল করে চলে যায়।

কাজেই আত্মসমালোচনা করুন। আপনার অনুষ্ঠান কেনো দেখেনা নিজের ঘরেই খবর নিন। আমি খবরের কারবারি। আমি জানি আমার দেশে খবরটা ভালো হয়। এই দেশ খবরে ভর্তি। চোখ কান খোলা রাখলেই খবর মেলে। দেশের মানুষও খবরের ভক্ত। খালি খবর জানতে চায়। কারো সাথে দেখা হলেই বলে, কি খবর? তার মানে খবরের খুবই চাহিদা। এই খবর নিয়ে মানুষের কাছাকাছি যাওয়া সম্ভব ছিল। আমাদের মাইন্ডসেট হয়ে গেছে হট খবর মানেই শুধু সরকারের বিরুদ্ধে খবর, রাজনীতির খবর। প্রতিদিনের মন্ত্রী মিনিস্টারের খবর। কিন্তু এর বাইরের খবরের খবরই নিই না। বর্তমানে অতিমাত্রায় নিয়ন্ত্রিত হওয়ায় আর অনুসন্ধানমূলক রিপোর্ট না থাকায় এই খবর শোনার প্রতিও মানুষ আগ্রহ হারিয়ে ফেলেছে। সব টিভিতেই একই মার্কা খবর। একই ধরনের উপস্থাপনা। কোথাও নতুনত্ব নেই।

টকশোর একটা চাহিদা ছিল। কিন্তু এখানেও কোনো নতুনত্ব নেই। সব এক ফরমেটে চলছে। আলোচনার বিষয় শুধু রাজনীতি। প্রতিদিনের আলোচক কিছু চেনা মুখ। আর এই চেনামুখগুলো সব বিষয়ে বিশেষজ্ঞ। তারা জানেন না এমন কোনো বিষয় নেই। মানুষ তাদের দেখতে দেখতে বিরক্ত হওয়ায় এখন টকশোরও আর দর্শক চাহিদা নেই।

করোনাকালে তিন মাস ধরে বাসায় বন্দি। যেহেতু মিডিয়ায় কাজ করি, ফলে সবকিছুতেই একটা খবর নেয়ার বাতিক আছে। তিনমাস বাসার সদস্যদের পর্যালোচনা করে দেখেছি তারা দু’একটা টিভির খবর দেখে, মিউট করে স্ক্রল দেখে একটা টিভিতে বাংলায় ডাবিং করা বিদেশী সিরিয়াল দেখে। বাচ্চারা দূরন্ত টিভি দেখে। এ ছাড়া বেশীরভাগ সময় ভারতের জি-বাংলাসহ অন্যান্য চ্যানেলের সিরিয়াল দেখে। কোনো সিরিয়াল মিস দিতে চায় না। কি আছে এসব সিরিয়ালে যাতে নেশা ধরিয়ে দেয়? আমাদের নির্মাতারা কি এ নিয়ে কোনো গবেষণা করেছেন?

এই করোনাকালেও আমাদের টিভিগুলো ঘরে বন্দি থাকা দর্শকদের চাহিদামতো কোনো অনুষ্ঠান তৈরী করতে পারলো না। অন্তত আমার চোখে পড়েনি। অথচ পশ্চিমবাংলার টিভিগুলো কিন্তু নানা অনুষ্ঠান বানিয়েছে ঘরে বসে থেকেই। দর্শক দেখেছেও। জাস্ট আইডিয়া।

প্রযুক্তির কল্যাণে এখানেও অনেককিছুই করা সম্ভব ছিল। কিন্তু আমরা এসব চিন্তার ধারে কাছেই যেতে চাইনা। শুধু বলা হয়, টাকা নেই,বাজেট নেই, স্পনসর নেই। এই নেই নেই করেই আমরা তলানিতে যাচ্ছি।

বস্তাপচা নাটক আর ত্রিশ বছর আগের সিনেমা নিয়ে দর্শকের কাছাকাছি যেতে পারবেন না। মানুষ সব ইউটিউবমুখি হয়ে যাচ্ছে,ফেসবুকে চলে আসছে । বিজ্ঞাপনের বাজারও চলে যাচ্ছে। সামনে কঠিন সময় আসছে। এমনিতেই মহামারির কারণে বাজার মন্দা। অর্থনীতির অবস্থা টালমাটাল। এ অবস্থায় টিকে থাকতে হলে সবকিছুতেই নতুনত্ব আনতে হবে। মনে রাখতে হবে পাশের পশ্চিমবঙ্গের চেয়ে কয়েকগুণ বেশী দর্শক আমাদের। ১৭ কোটি মানুষের বাজার। হেলাফেলা নয় কিন্তু। তারা আমাদের বাজার দখল করে ফেলছে অথচ আমরাই আমাদেরটা দখল করতে পারলাম না। এটাই দুঃখ।

লেখক পরিচিতি: শংকর মৈত্র, সিনিয়র সাংবাদিক