ই-কমার্সের দুনিয়ায়

0
847

জয়ন্তী সামান্থা: আমি ব্যবসা শুরু করি একদমই শুন্য হাতে, সেটা আগেও লিখেছিলাম। কোন অভিজ্ঞতা নেই, ব্যবসায়িক কোন জ্ঞান নেই। আমি স্থপতি বলে কেউ হয়তো বলবেন, যে ফার্ম দেয় যেসব স্থপতিরা, তারাও তো ব্যবসাই করছেন। তারাই ব্যবসা ভালো করেন বলে আমি মনে করি, যাদের ভেতরে ব্যবসায়ী ম্যাটেরিয়াল আছে। আসলে আমার মধ্যে ব্যবসায়ী ম্যাটেরিয়াল-টাই নাই। সে কারণেই হন্যে হয়ে চাকরির আশায় ঘুরেছি। কিন্তু মেলেনি জুতসুই কিছু। যেহেতু পাশ করার পরের কয়েক বছর চাকুরি করেছি এবং বসও ভদ্রলোক ছিলেন, তাই পরবর্তী চাকরিতেও অমন ধরনের বস খুঁজেছি, কিন্তু পাইনি। তবে তাতে সমস্যা যেটা হল যে আমি নিজের খরচ না পেয়ে পাগল হয়ে যাচ্ছিলাম। বাচ্চা হবার কারণে ই-কমার্সের এদিক-সেদিক খুঁজে দেখা শুরু করি।

মজার ব্যাপার হচ্ছে-চাকুরি করা অবস্থায় আমি নিজেও অনলাইনে কেনাকাটা করেছি এবং মনে মনে বকেছি ছবি ও বাস্তব পণ্যের তফাতের জন্য। তাই নিজে যে সে পথে নামব, একবারও ভাবিনি সেটা।

কিন্তু যখন নেমে গেলাম, তখন ভয় লাগতে শুরু হলো।

আপনারা যারা ব্যবসা করেন, তারা প্রথমে সোর্সিং করেন, উপকরণ কেনেন। তারপর প্রডাকশনে নামেন। তারপর যদি সেল না হয়, সেটা নিয়ে কি চিন্তিত হন? কিংবা যদি সেলের পর নেগেটিভ রিভিউ আসে?

আমারও তাই হয়। ভয় হতে থাকে আদৌও সেল হবে কিনা ভেবে। এর কারণ অবশ্য অনেকগুলাই ছিল।

প্রথমত আমার গয়নার উপকরণ। আমি কেন যেন একটু অন্য ধরনের উপকরণ পছন্দ করতাম। আসলে এখনো করি। আমি কাগজ দিয়ে কানের দুল বানিয়েছি। কর্ক শিট বলে পাতলা এক ধরনের ফোম হয়, আমি সেগুলো দিয়েও কানের দুল করেছি। কিন্তু যে কোন কারণেই হোক না কেন, সেগুলো জনপ্রিয়তা পায়নি। সবাই পছন্দ করে মেটাল। এটাও জেনেছি এই অনলাইন দুনিয়া থেকেই।

তবু আমি মনে করি এই ভিন্নধর্মী উপকরণই আমাকে চেনাবে সবার কাছে।

দড়ি আমার অত্যন্ত পছন্দের উপকরণ। প্রথমে দড়ি দিয়ে গয়না বানানোর পর নিজেই পড়ে দেখি। এখন মনে হয় অনেকেই পড়ে দেখতে আগ্রহী হচ্ছেন। এটুকু প্রাপ্তি আমার এই ই-কমার্সের বদৌলতেই। তাই আমার চিন্তা ভাবনারও এখন পরিবর্তন হচ্ছে।

কিছুদিন আগে আমার একজন বিদেশী বান্ধবীর সাথে কথা হবার সময় ওকে আমার কিছু গয়নার ছবি পাঠাই। সাথে সাথেই সে এতো পছন্দ করে ফেলে এবং বলে যাতে আমি দেশের বাইরের শিপমেন্টের চিন্তাও করি। তারপর থেকেই আমার স্বপ্নও বদলাতে থাকে। যে আমি আগে অনলাইন হোক বা অফলাইন-যে কোন ব্যবসা নিজে করতে দশ বার চিন্তা করতাম, সেই আমি এখন চিন্তা শুরু করেছি নিজের এই গয়নার ব্যবসাকে আরও কিভাবে বাড়িয়ে বিদেশের মাটিতেও বাংলাদেশ কে দেশিয় ব্রান্ড হিসেবে তৈরি করব।

এখন আমার স্বপ্ন এটাই, যেটার কারণে আমি ঘুমাতেও পারছিনা ঠিক মত। আমার বাচ্চাটা ছোট বলে মা অবশ্য ধৈর্য্য ধরতেই বলছেন এবং তাই চেষ্টা করছি আমিও। তবে সবার কাছেই দোয়া প্রার্থী এই স্বপ্ন পূরণে।

আমি জয়ন্তী। নারায়ণগঞ্জ থাকি আর গুড়া ডাইনোসর (আমার ১৭ মাস বয়সী দুরন্ত ছেলে) পালি আর সে ঘুমালে গভীর রাতে গয়না বানাতে বসি।

লেখক পরিচিতি: জয়ন্তী সামান্থা; স্থপতি, নৃত্যশিল্পী ও পয়া শানা’র স্বত্ত্বাধিকারী।