করোনা মোকাবেলায় লকডাউন কতটা জরুরী?

0
378

শামসুল ইসলাম: চীন থেকে উৎপত্তি এবং এখান থেকে গোটা বিশ্বের প্রতিটি কোনা দাপিয়ে বেড়াচ্ছে সার্স-২ বা কোভিড-১৯ নামক করোনা ভাইরাস। এটি ইতোমধ্যে কেড়ে নিয়েছে চার লাখের উপরে মানব প্রাণ। আরও কত প্রাণ কেড়ে নিবে এ রাক্ষুসে ভাইরাসটি তা বলা মুশকিল। বিশ্বের এক অঞ্চলে কিছুটা স্থিতাবস্থা আসতে না আসতে ভাইরাসটি তার আঘাতে ক্ষত-বিক্ষত করে চলেছে আরেক অঞ্চল। যেসব দেশ কিছুটা মুক্তি পেয়েছে তারাও আতংকে প্রহর গুনছে, দ্বিতীয় ঢেউ আছড়ে পড়ে কখন! বিশ্বের তাবত বিজ্ঞানীরা নির্ঘুম রজনী পার করছেন ভাইরাসটির সম্ভাব্য টিকা বা প্রতিষেধক আবিষ্কারের জন্য। কিন্তু কেউ জোর গলায় বলতে পারছেন না শীঘ্রই কাংখিত টিকা আবিষ্কার করে ফেলবেন। বরং মানুষকে এই ভাইরাসের সাথে আরো বহুদিন বাস কর‍তে হবে বলে সতর্ক করছেন অনেক গবেষক।

চীন থেকে বিশ্বময় ছড়িয়ে পড়া এ ভাইরাস নিয়ন্ত্রণের প্রাথমিক করণীয়ও চীনই বিশ্বকে দেখিয়েছে। আর তার নাম “লকডাউন”। সম্ভবত চলতি শতাব্দীর এ পর্যন্ত বহুল ব্যবহৃত শব্দগুলির একটি হবে লকডাউন।
এখন পর্যন্ত ভাইরাসের সর্বগ্রাসী ভয়াল রূপ রুখে দিতে সবচেয়ে কার্যকর ও স্বীকৃত পন্থাও এটি। ব্রিটেনের ইম্পেরিয়াল কলেজের এক গবেষণা বলছে লকডাউনের কারণে কেবল ইউরোপে প্রাণ বাঁচানো গেছে প্রায় ৩ মিলিয়ন মানুষের! তারা কেবল ১১টি ইউরোপীয় দেশের উপর এ গবেষণা করেছেন। এই দেশগুলোতে এখন পর্যন্ত ১ লাখ ৩০ হাজার মানুষ মারা গেছেন প্রাণঘাতী এ ভাইরাসে। লকডাউন না হলে তা হতো ৩০ লাখের উপরে! গবেষণাটি বলছে লকডাউন না হলে যুক্তরাজ্যে প্রায় ৪ লাখ ৭০ হাজার, ফ্রান্সে প্রায় ৭ লাখ, ইতালিতে ৬ লাখ ৩০ হাজার মানুষ মারা যেতে পারত। আর বিশ্বজুড়ে মৃত্যুর সে সংখ্যা হতো কয়েকগুণ বেশী।

কেমন ছিল বাংলাদেশের লক ডাউন

গুগল ট্রান্সলেটে লকডাউনের বাংলা খুঁজতে গিয়ে লকডাউনই পেলাম। বিশ্বজুড়ে লকডাউন বলতে একেবারেই জরুরী প্রয়োজন ছাড়া বাইরে বের না হয়ে ঘরে সেচ্ছা বন্দী থাকাকে বুঝানো হয়েছে। জরুরী প্রয়োজন আবার নিত্য প্রয়োজনীয় দ্রব্য ও ঔষধ ক্রয়ের মধ্যেই সীমাবদ্ধ ছিল। বাংলাদেশে কি আদপে তা হয়েছে? এক কথায় না, হয়নি। বাংলাদেশে লক ডাউনের বাংলা তরজমা করা হয়েছে সাধারণ ছুটি বলে। ছুটি বললেই বাংলা কেন বিশ্বের যে কোন অঞ্চলের মানুষের মনে এক ধরনের বাধ ভাঙা আনন্দ আর উচ্ছ্বাসের শ্বাশত ছবিই ভাসে। এক্ষেত্রেও এর ব্যতিক্রম হয়নি। প্রথম দু’একদিন বিভিন্ন বাহিনী রাস্তায় নেমে ছুটির ভিন্ন অর্থ দিতে চেষ্টা করলেও দ্রুতই তা মিইয়ে যায়। ছুটি উদযাপনের ঢেউ আছড়ে পড়ে বাস, ট্রেন, লঞ্চ আর ফেরিঘাটে। শহর থেকে গ্রামের প্রতিটি কোনায় পৌঁছে যায় চীনা ভাইরাসটি। ঘটতে থাকে কমিউনিটি ট্রান্সমিশন। এভাবে বাংলাদেশ আজ পরিণত হয়েছে এ প্রাণঘাতী ভাইরাসের প্রজনন ক্ষেন্দ্রে। প্রতিদিন জ্যামিতিক হারে বাড়ছে সংক্রমণ। ১০/১২ হাজার পরীক্ষায় ধরা পড়ছে আড়াই /তিন হাজার পজিটিভ! লাখ খানিক টেস্ট হলে বিশ্বের সবচেয়ে করোনা সংক্রমণ দেশ হবে বাংলাদেশ। প্রতিদিনকার স্বাস্থ্য বুলেটিনে মৃত্যু হার কম দেখা গেলেও সেরে উঠা রোগীর হারও বিশ্বে সর্বনিম্ন। করোনা রোগীর চরম পর্যায়ে যেতে সময় লাগে গড়ে দেড় সপ্তাহ। সে হিসাবে এখনই বলা যাচ্ছে না, আক্রান্ত করলেও আমাদের মারতে পারবে না করোনা!
ইতোমধ্যে ভেঙে পড়েছে স্বাস্থ্য ব্যবস্থা। অবশ্য দেশে আদৌ কোন স্বাস্থ্য ব্যবস্থাই ছিল না! যে সিলেটে ব্যাঙের ছাতার মত দাঁড়িয়ে আছে অসংখ্য প্রাইভেট ক্লিনিক সেই সিলেটে রোগী নিয়ে ঘুরতে ঘুরতে ঠাঁই হচ্ছে না কোথাও, শেষমেশ মরতে হচ্ছে বিনা চিকিৎসায়।

এই পরিস্থিতে আবারও করোনা মোকাবেলার এখন পর্যন্ত স্বীকৃত মাধ্যম লকডাউনের বিকল্প নাই। লকডাউন মানে সাধারণ ছুটি নয়, বলতে হবে কারফিউ! বাংলাদেশে লকডাউন মানে সান্ধ্য আইন বলতে হবে। তবে এখন আর ১/২ সপ্তাহর লকডাউনে হবে না, লাগবে ১/২ মাস! বাংলাদেশ কি পারবে? সে সামাজিক বা অর্থনৈতিক সক্ষমতা কি আছে আমাদের? যদি না পারি? আল্লাহই ভালো জানেন।

লেখক পরিচিতি: শামসুল ইসলাম; প্রবাসী সাংবাদিক।