কিছু মৃত্যু কাঁদতেও দেয় না…

0
1049

ফেসবুকজুড়ে আজ রত্নার জন্য শোকের ছায়া। তরুণ সংস্কৃতি কর্মী। মানবিক মানুষ। কষ্ট লুকিয়ে হাসি মুখে থাকতে জানতো। করোনার কারণে কাছের মানুষগুলো যখন অসুস্থ হতে থাকলো, মারা যেতে লাগলো তখন (৬ জুন) ফেসবুকে রত্না লিখলো, “কে জানে এই মহামারীকে আমরা কয়জন জয় করতে পারব? যদি কোনদিন কোন ভুল করে থাকি, ক্ষমাপ্রার্থী।”

করোনা রত্নাকে ছুঁতে পারেনি। তবে জীবন তাকে থামিয়ে দিয়েছে। উচ্ছ্বল মেয়েটা আজ নিথর হয়ে গেছে।

রত্নার শেষ কর্মস্থল ছিল অ্যাডকম লিমিটেড। এর আগে মাছরাঙা ও বৈশাখী টেলিভিশনে কাজ করেছেন প্রয়োজনা বিভাগে। বিশ্ব সাহিত্য কেন্দ্রে দায়িত্ব পালন করেছে সংস্কৃতি বিষয়ক সমন্বয়ক হিসেবে। এছাড়া কনসিটো পিআর-এ ডেপুটি মিডিয়া কো-অর্ডিনেটর এবং বাংলা ট্রিবিউনে প্রদায়ক হিসেবে কাজ করেছে।

ইডেন কলেজের ছাত্রী কাজী রত্না ভারতে চলচ্চিত্র নিয়ে পড়াশোনা করেছে। তার সাথে আমার সম্পর্কটা ছিল মা-ছেলে, কিংবা বাবা-মেয়ের মত।

আমাকে দেখলেই কাজী রত্না দৌড়ে এসে আর জড়িয়ে ধরবে না। কারও সাথে পরিচয় করিয়ে দিতে গিয়ে বলবে না, ‘আমার কুড়িয়ে পাওয়া মামা। আমি কুড়িয়ে পাওয়া ভাগ্নি। কুড়িয়ে পাওয়া হলেও আমাদের সম্পর্ক কিন্তু নাড়ীর।’

মারে, কেন চলে গেলি!

ব্লাড প্রেশারের সমস্যা ছিল। সকালে স্ট্রোক করলো। প্রতিবেশীরা তাকে নিয়ে হাসপাতালে পৌঁছার আগেই সব শেষ হয়ে গেল। মাত্র গত মাসেই ৩৫ পেরিয়ে ৩৬ বছরে পরেছিল। চলে যাওয়ার জন্য সময়টা একেবারেই মানান সই না।

রত্নাকে চিনতাম তার পিচ্চি বেলা থেকে। তখন সে শিশু একাডেমির নিয়মিত যাত্রী। নাচ, গান, অভিনয়, আবৃত্তি… কিসে নেই? তাদের সার্কেলটা ছিল বেশ মজার। এক পাল পিচ্চি। রিপন, রওনক, নাসির-সহ আরও কয়েকজনের গ্রুপ।

একটা সময়ে আমার একজন নারী সহকারি প্রয়োজন হলো। নাটক, স্বল্প দৈর্ঘ্য চলচ্চিত্র বা প্রামান্য নাটকে মেয়ে শিল্পীদের সাথে তাদের কস্টিউম বা মেকাপ নিয়ে সরাসরি কথা বলতে সঙ্কোচ হতো বলে একজন নারী সহকারি রাখতাম। রত্না কাজ খুঁজছিল। তাকে পছন্দ করতাম বলে কাজে যুক্ত করলাম। আমার অনেকগুলো কাজে সহকারি ছিল সে।

মায়ের কোলে ছোট্ট রত্না

বাচ্চাদের একটা ম্যাগাজিন অনুষ্ঠানেও সে আমার সহকারি। একদিন কাজ শেষ করতে করতে রাত ১২টা বেজে গেল। আমাকে বললো, ‘ভাইয়া, বাসায় গেলে আজ খবর আছে। আম্মা আজ পিটায়া মাইরা ফেলবো।’ বললাম, টেনশন করো না। আমি আন্টিকে ফোন দিচ্ছি।

রত্নার আম্মাকে ফোন দিয়ে জানালাম, টেনশন করার দরকার নেই। আমি নিজে পৌঁছে দিব। তিনি বললেন, ঠিক আছে।

রত্নাকে নিয়ে বের হলাম রাত ১টার দিকে। ওরা তখন বিএমএ ভবনের ওখানে থাকে। গ্রীন রোড ক্রস করার সময় একটা বাসা দেখিয়ে রত্না বললো, ‘এটা আমার নানার বাসা। ওনারা অবশ্য চিটাগাং থাকেন।’ আমি চমকালাম। কারণ, ওটা আমার খালার বাসা।

এরপর খালা, খালু ও খালাতো ভাই-বোনদের নাম বলে জানতে চাইলাম তারা কি হয়। রত্নাও অবাক। আমি তাদের কি করে চিনি জানতে চাইলো। আমি রত্নাকে জিজ্ঞেস করলাম, তার গ্রামের বাড়ি কোথায়। তার মামা বাড়ি কোথায়। রত্না বললো। আমি তার দুই মামা আর মা-খালার নাম বলে পরিচয় নিশ্চিত হতে চাইলাম। রত্না বললো, ভাইয়া, আপনি আমার আম্মা, খালা, মামাদেরও চিনেন?

আমি বললাম, থাবড়া দিয়া রিকশা থেকে ফালায়া দিমু বেয়াদ্দব মাইয়া। থতমত খায় রত্না। হঠাৎ কি হলো। সে জানতে চায়, ভাইয়া, কি করলাম আমি? আমি আবার বললাম, ঠাটায়া থাপ্পড় মারমু। মামা ডাক, ভাইয়া কিসের?

মা’কে হারানোর পর প্রথমে বাবাই হয়ে ওঠেন রত্নার মা ও বাবা। ওই সময়ে মেয়ের মাথায় তেল দিয়ে চুলও বেধেঁ দিতেন তিনি। পরে রত্না-ই তার বাবাকে ছোট্ট শিশুর মত আগলে রাখতো।

রত্নার সাথে আমার সম্পর্ক রক্তের। ৪ দিক দিয়ে আত্মীয়তা। সব সম্পর্কই গিয়ে ঠেকেছে মামা-ভাগ্নিতে। সবচেয়ে কাছের সম্পর্কটা হলো, তার মা রানু আপা (রেহানা) আমার চাচাতো বোন। রেনু আপা মারা গেলেন ৮/১০ বছর আগে। হাসপাতালে ছিলেন দীর্ঘদিন। লাইফ সাপোর্টে রাখা হয়েছিল। আর্থিকভাবে নিঃস্ব হয়ে যাচ্ছিলেন দুলাভাই। তাকে বোঝালাম, আপা আর ফিরবেন না। শুধু শুধু হাসপাতালে রেখে শেষ সম্বল জমিটুকুও বেঁচে দেয়া ঠিক হবে না। পরে লাইফ সাপোর্ট খুলে নেয়া হয়েছিল।

২০১৭ সালে রানু আপার ভাই, আমাদের চাচাতো ভাই (আতাউর রহমান, আমরা আতা ভাই ডাকতাম) মারা গেলেন। তার মৃত্যুর শোক সইতে না পেরে রত্নার খালা রেনু আপা মারা গেলেন। রেনু আপার মৃত্যুর সংবাদ পেয়ে মারা গেলেন তার ছোট ভাই। একজন আগেই বিদায় নিয়েছেন। ২০১৭ সালে এপ্রিলের শেষ থেমে জুনের প্রথম সপ্তাহের মধ্যে ৪ ভাই-বোনের বাকি তিনজনই মারা গেলেন। সেই থেকে শুরু রত্নার কষ্টের দিন।

মা মারা যাওয়ার পর রত্না আর তার বাবা খুব একা হয়ে গেলেন। দুলাভাইও একদম শিশুর মত হয়ে গেলেন। রত্না তার বাবাকে নিয়ে বেঁচে ছিল। বাবাকে ওড়না দিয়ে গায়ের সাথে বেঁধে স্কুটিতে করে কখনও ডাক্তারের কাছে, কখনও ঘুরতে নিয়ে যেত। কিছুদিন আগে রত্নার বাবাও মারা গেলেন। মেয়েটা একদম একা হয়ে গেল।

খুব স্বাধীনচেতা মেয়ে। পরীশ্রমী। রাজনীতি সচেতন। সততা বিসর্জন দেয়নি কখনও। চাকরির পর চাকরি ছাড়তে হয়েছে কম্প্রোমাইজ করেনি বলে।

২০১০ সালের নভেম্বর। আমরা মুক্তিযুদ্ধভিত্তিক প্রামান্য নাটক নির্মাণ করছি। কুষ্টিয়ার বংশীতলা, চট্টগ্রামে পাহাড়তলী রেল কলোনী ও কুমিল্লার লাকসামে… মাত্র ৫ দিনে দেশের এ মাথা থেকে ও মাথা ঘুরে কাজ করলাম। ২৭ নভেম্বর ঢাকায় ফিরি। সবাইকে নামিয়ে দিয়ে রত্নাকে বাসায় নিয়ে আসি। আমি তখন বনশ্রীতে থাকি। বাসায় এসে সে ফ্রেশ হলে বললাম, একটু ঘুমিয়ে নাও। রত্না বললো, না মামা, ইন্টারভিউ আছে। রত্না ঘুমালো না।

রত্না জানালো মাছরাঙা টেলিভিশনে ইন্টারভিউ দিতে যাবে। বললাম, আগে জানাওনি কেন, তাহলে গতকালই তোমাকে ঢাকা পাঠিয়ে দিতাম।

রত্না ইন্টারভিউ দিতে গেল। কাজের অভিজ্ঞতা এবং প্রসঙ্গক্রমে জানালো সকালেই শ্যুটিং থেকে ফিরেছে। বিকেলে প্যানেলে বসবে। কার কি কাজ করছে শুনে আবুল হোসেন খোকন ভাই আমাকে ফোন দিলেন। রত্না সম্পর্কে জানলেন। রত্না বেশ কিছুদিন ছিল মাছরাঙা টিভিতে। এরপর অ্যাডফার্মে কাজ করেছে। আমার মত সেও বছরের পর বছর এক প্রতিষ্ঠানে চাকরি করেনি। এ নিয়ে আমরা মজা করতাম। বলতাম, তোর আর আমার শিল্পপতি হওয়া দরকার ছিল। গোলামীর জীবন আমাদের জন্য না।

পাহাড়, সাগর, জঙ্গল… যখন যে ডেকেছে ছুটে গেছে রত্না। প্রকৃতির সাথে কি অদ্ভূত সখ্যতা ছিল তার। ঘন্টার পর ঘন্টা দাঁড়িয়ে থাকা বা হাঁটা কোন ব্যাপারই ছিল না তার জন্য। পরিশ্রমী আর কর্মঠ বলতে যা বোঝায় এক কথায় রত্না ছিল তা-ই।

কত শত-সহস্র স্মৃতি আমার এই কুড়িয়ে পাওয়া ভাগ্নিটার সাথে।

মারে, তুইতো কুড়িয়ে পাওয়া মামা হিসেবেই পরিচয় দিতি না, কখনও কখনও বলতি, এটা আমার পোলা। ছেলেকে রেখে কেন চলে গেলি?