খুনীদের দায়মুক্তি দিয়েছে জিয়া ও খালেদা

0
283

প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা দেশে খুনের রাজনীতি শুরু এবং খুনীদের মদদ দেয়ার অভিযোগ করেছেন জিয়াউর রহমান এবং তার স্ত্রী খালেদা জিয়ার বিরুদ্ধে। প্রধানমন্ত্রী বলেছেন, জিয়াউর রহমান ইনডেমনিটি অর্ডিন্যান্স দিয়ে বঙ্গবন্ধুর খুনীদের রক্ষাকবচ দিয়েছিল। একইভাবে খালেদা জিয়াও অপারেশন ক্লিনহার্টের মাধ্যমে আওয়ামী লীগের নেতা-কর্মীসহ শত শত মানুষ হত্যাকারীদের দায়মুক্তি দিয়ে গেছে।

বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানসহ ১৯৭৫-এর ১৫ই আগস্টের শহীদদের স্মৃতির প্রতি শ্রদ্ধা জানিয়ে সভার শুরুতে নীরবতা পালন করা হয়

শেখ হাসিনা বললেন, অনেকে ভুলে গেছে… খালেদা জিয়া ২০০১ সালে প্রহসনের নির্বাচনের মাধ্যমে ক্ষমতায় এসে অপারেশন ক্লিনহার্টের নামে বহু মানুষকে নির্মমভাবে হত্যা করেছে।

রোববার বিকেলে জাতির পিতার ৪৫তম শাহাদাৎ বার্ষিকী এবং জাতীয় শোক দিবস উপলক্ষে বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ আয়োজিত স্মরণ সভায় সভাপতির ভাষণে প্রধানমন্ত্রী এবং আওয়ামী লীগ সভাপতি শেখ হাসিনা এ সব কথা বলেন।

ভার্চ্যুয়াল প্লাটফর্মে অনুষ্ঠিত স্মরণসভায় দলীয় সভাপতি শেখ হাসিনা গণভবন থেকে ভিডিও কনফারেন্সের মাধ্যমে আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে আয়োজিত অনুষ্ঠানে যোগ দেন।

শেখ হাসিনা বলেন, অপারেশন ক্লিনহার্টের নামে আওয়ামী লীগ, যুবলীগ এবং ছাত্রলীগের নেতা-কর্মীদের যেখানেই যাকে পেয়েছে নির্যাতন করে হত্যা করেছে।

ক্লিনহার্টের নামে আওয়ামী লীগের রিচার্স সেন্টার দখল, বই-পত্র, ৩শ’ ফাইল, কম্পিউটার হার্ডডিস্ক এবং নগদ টাকা লোপাটসহ রাজনৈতিক কর্মসূচি বন্ধ করে দেয়ায় খালেদা জিয়ার বিরুদ্ধে তিনি অভিযোগ উত্থাপন করেন। বলেন, সেই সব হত্যার বিচার হবে না… এই ইনডেমনিটিও খালেদা জিয়া দিয়ে গেছে।

প্রধানমন্ত্রী বলেন, যে পাশা (বঙ্গবন্ধুর খুনী) মৃত্যুবরণ করেছে তাকে প্রমোশন দিয়ে তার সমস্ত টাকা-পয়সা স্ত্রীকে দেয়া হয়েছে। যে খায়রুজ্জামানের (খুনী) চাকরী চলে গিয়েছিল কিন্তু খালেদা জিয়া ক্ষমতায় এসে তাকে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের চাকরীতে পুণর্বহাল করে এবং প্রমোশন দেয়।

তিনি বলেন, সামনেই খায়রুজ্জামানের খুনের মামলার বিচারের রায় হওয়ার কথা থাকলেও তাকে প্রমোশন দিয়ে সবাইকে বুঝিয়ে দেয় প্রধানমন্ত্রী হিসেবে তাকেই সে (খালেদা জিয়া) সমর্থন করে।…এর অর্থটা কি দাঁড়ায় বলে প্রশ্ন করেন শেখ হাসিনা।

জিয়া এবং খালেদা জিয়ার প্রসঙ্গে শেখ হাসিনা বলেন, এভাবেই তারা হত্যার রাজনীতি এদেশে শুরু করেছে।

আওয়ামী লীগ সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদের দলীয় কার্যালয় থেকে সূচনা বক্তব্য রাখেন। অনুষ্ঠানে বক্তব্য দেন সভাপতিমন্ডলীর সদস্য অ্যাডভোকেট জাহাঙ্গীর কবির নানক, কেন্দ্রীয় সদস্য আ খ ম জাহাঙ্গীর হোসেন, মহানগর দক্ষিণের সভাপতি মুক্তিযোদ্ধা আবু আহমেদ মান্নাফি এবং মহানগর উত্তরের সভাপতি শেখ বজলুর রহমান। অনুষ্ঠান সঞ্চালনা করেন প্রচার ও প্রকাশনা সম্পাদক ডক্টর আব্দুস সোবহান গোলাপ।

বিচার বহির্ভূত হত্যা প্রসঙ্গে প্রধানমন্ত্রী ও আওয়ামী লীগ সভাপতি বলেন, বিচার বহির্ভূত হত্যার কথা আজ সবাই বলে- সবাই ভুলে গেছে যে খালেদা জিয়া ক্ষমতায় আসার পর অপারেশন ক্লিন হার্টের নামে বহু মানুষকে নির্মমভাবে হত্যা করা হয়েছে।

জিয়ার সময়ে সংঘটিত ১৯টি ক্যু’র কারণে অফিসার ও সৈনিক হত্যার প্রসঙ্গ টেনে প্রধানমন্ত্রী বলেন, সব থেকে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছিল আমাদের সেনাবাহিনী এবং বিমান বাহিনী। বিমান বাহিনীর ৬৬৫ জনকে আর সেনা বাহিনীর দুই থেকে আড়াই হাজার জনকে হত্যা করা হয়েছিল।

জিয়াউর রহমানের শাসনামল সম্পর্কে তিনি আরও বলেন, আমাদের সেনাবাহিনীর যত মুক্তিযোদ্ধা অফিসার ছিল তাদের একে একে হত্যা করেছে। হাজার হাজার অফিসার এবং সৈনিককে নির্বিচারে হত্যা করেছে। কাউকে কোর্ট মার্শাল দিয়েছে, কাউকে গুলি করে হত্যা করেছে।

তিনি বলেন, এভাবে বহু মায়ের কোল খালি হয়েছে, কেউ একটা প্রতিবাদ করার সাহস পেত না, কারণ, কেউ প্রতিবাদ করলে সে আর জীবিত থাকতো না। সাদা গাড়িতে করে তুলে নিয়ে কোথায় ফেলে দিত, লাশও পাওয়া যেত না।

তিনি গুম খুনের শিকার খুলনা, চট্টগ্রাম, নারায়ণগঞ্জসহ সারাদেশের কয়েকজন আওয়ামী লীগ এবং সহযোগী সংগঠনের নেতা-কর্মীর নাম উল্লেখ করে বলেন, এরকম বহু ঘটনা আছে এবং আমার মনে হয়, সেগুলো আবার স্মরণ করা উচিত, কারণ কিভাবে একটা দেশে খুনের রাজত্ব তারা শুরু করেছিল।

শেখ হাসিনা বঙ্গবন্ধুর হত্যার অভিযোগে জিয়াকে আবারও অভিযুক্ত করে বলেন, ১৯৮০ সালে লন্ডনে হাউস অব কমন্স সদস্য স্যার টমাস ইউলিয়াম কিউসি এবং শ্যন ম্যাকব্রাইটকে নিয়ে বঙ্গবন্ধুর হত্যাকান্ডের নিরপেক্ষ তদন্তে গঠিত কমিশনকে এদেশে আসার ভিসা না দিয়ে এবং খুনীদের ইনডেমনিটির মাধ্যমে দায়মুক্তি প্রদানসহ বিশ্বের বিভিন্ন দেশের দূতাবাসে চাকরী দেওয়ার মাধ্যমে প্রমাণ করেছে সে এই হত্যাকাণ্ডে জাড়িত ছিল। শুধু তাই নয়, বিবিসি’তে দেয়া সাক্ষাতকারে বঙ্গবন্ধুর আত্মস্বীকৃত খুনী ফারুক এবং রশিদও জিয়ার জড়িত থাকার উল্লেখ করেছিল।

তিনি এ সময় পাকিস্তানের কর্নেল বেগের (পরবর্তীতে সেনা প্রধান) জিয়াউর রহমানকে লেখা একটি চিঠি, যা জাহাঙ্গীর কবির নানক অনুষ্ঠানে পড়ে শোনান তার উদ্ধৃতি দিয়ে প্রশ্ন তোলেন,‘ চিঠিতে জিয়াকে নতুন কাজ দেয়ার যে কথা বলা হয়, তা ১৫ আগস্টের এই হত্যাকান্ডের অ্যাসাইনমেন্ট ছিল কি?

শেখ হাসিনা আরো বলেন, বিচারাধীন যুদ্ধাপরাধী আলবদর, রাজাকার, আল-শামসদের জেল থেকে ছেড়ে দিয়ে মন্ত্রী-উপদেষ্টা করে রাজনীতি করার সুযোগ করে দিয়েছিল এই জিয়াউর রহমান।

স্মৃতিচারণ করে শেখ হাসিনা বলেন, ‘রাষ্ট্রপতির মেয়ে হয়েও তাদের নাম-পরিচয় গোপন করে নির্বাসিত রিফ্যুউজি জীবন কাটাতে হয়েছে। অন্যদিকে খুনিরা বিভিন্ন দূতাবাসে আরাম-আয়েশে জীবন কাটিয়েছে।

তিনি বলেন, ‘খুনিদের বিচার না করার ইনডেমনিটি দিয়েছিল জিয়াউর রহমান আর সন্ত্রাসীদের ইনডেমনিটি দিয়েছিল তার স্ত্রী খালেদা জিয়া।

বেঈমানরা কখনোই ক্ষমতায় থাকতে পারে না উল্লেখ করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘মীর জাফরও ক্ষমতায় থাকতে পারেনি। সিরাজদ্দৌলাকে হত্যা করতে মীর জাফরকে ব্যবহার করা হয়েছে। সেই মীর জাফর দুইমাসের বেশি ক্ষমতায় থাকতে পারেনি। ঠিক মোশতাকও পারেনি। মোশতাককে হটিয়ে জিয়াউর রহমানই রাষ্ট্রপতি হয়েছিল। যে নিজেই নিজেকে রাষ্ট্রপতি হিসাবে ঘোষণা দিয়েছিল।

পরবর্তী সেনা শাসক এরশাদের বিরুদ্ধেও সন্ত্রাসের রাজনীতি অব্যাহত রাখার অভিযোগ এনে শেখ হাসিনা বলেন, ‘জেনারেল এরশাদ এসেও ২৪ জানুয়ারি আওয়ামী লীগের মিছিলে গুলি করে। সে এমন কোন ঘটনা নাই যে না ঘটিয়েছে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়সহ সব শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে কেবল বোমা আর গুলির শব্দ। সারাদেশে একটা আতংক আর নির্বাচনের নামে প্রহসন। কোথাও ব্যালটও লাগতো না, ভোটও লাগতো না।

তিনি সামরিক সরকারের সময়ে দেশের নির্বাচন সম্পর্কে বলেন, ‘তারা বলতো ১০টা হোন্ডা আর ২০টা গুণ্ডা… নির্বাচন ঠান্ডা-এইতো পরিস্থিতি ছিল বাংলাদেশের।

উচ্চ আদালত কর্তৃক সকল সামরিক শাসনকে অবৈধ ঘোষণা এবং তাদের জারিকৃত সব অর্ডিন্যান্স বাতিলের রায় ‘দেশকে অশুভ শক্তির হাত থেকে রক্ষা করেছে’ উল্লেখ করে তিনি বলেন, এর ফলে দেশের মানুষের মধ্যে আবার মুক্তিযুদ্ধের চেতনা ফিরে এসেছে। খবর: বাসস।