জবাব…

সাবেক অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আবদুল মুহিতকে নিয়ে সাংবাদিক ফজলুল বারীর লেখার জবাব দিয়েছেন মুক্তাদীর আহমদ মুক্তা

0
1618

মুক্তাদীর আহমদ মুক্তা: সাবেক অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আবদুল মুহিত সম্পর্কে ফেইসবুকে একটা মন্তব্য লিখেছেন সাংবাদিক ফজলুল বারী। উনি লিখেছেন, অর্থমন্ত্রী মুহিত মন্ত্রীত্ব থেকে বিদায় নেওয়ার পর উনার ছেলে সাহেদ মুহিত নাকি উনাকে উনার ধানমন্ডির বাসায় উঠতে বাধা দিয়েছিলেন । পরবর্তীতে প্রশাসনিক হস্তক্ষেপে এর সমাধান হয়। এই লেখা পড়ে একশ্রেণীর ফেইসবুক বুদ্ধিজীবী জনাব মুহিত ও তাঁর পরিবার সম্পর্কে বিভিন্ন অশ্রাব্য মন্তব্য করেছেন যা খুবই নিন্দনীয় ও আপত্তিজনক। আমি এই ঘটনার তীব্র নিন্দা জানাই।

আবুল মাল আবদুল মুহিত একজন অশীতিপর বৃদ্ধ মানুষ। স্বেচ্ছা অবসরে গিয়ে তিনি একটি সুন্দর পারিবারিক জীবন অতিবাহিত করছেন। এই সময় তাঁর ব্যক্তিগত ও পারিবারিক জীবন নিয়ে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে মনগড়া কল্পকাহিনী প্রকাশ শুধু নিন্দনীয় নয় গর্হিত অপরাধও বটে। একজন অনুজ প্রতিম সাংবাদিক এই ঘটনা দৃষ্টিতে আনার পর তাকে বলেছিলাম। এটি সঠিক নয়। উদ্দেশ্য প্রণোদিত। হয়তো কেউ বারী ভাইকে ভুল তথ্য দিয়ে এই লেখা প্রকাশে উৎসাহিত করেছেন। পরবর্তীতে ইন্টারনেট সুবিধার অভাবে এ বিষয়ে আর বিস্তারিত খোঁজ নেওয়ার সুযোগ হয়নি। পরে ফেইসবুকে এ বিষয়ে নানারকম মন্তব্য দেখে বিস্মিত ও হতবাক হয়েছি। মোবাইল ফোনে বাংলা লেখার সুযোগ না থাকায় যথাসময়ে এ বিষয়ে মন্তব্য করতে পারিনি।

আবুল মাল আবদুল মুহিতের সঙ্গে আমার পরিচয় ২০০০ সাল থেকে। এর আগে সিলেট মুসলিম সাহিত্য সংসদে বিভিন্ন অনুষ্ঠানে উনাকে দেখেছি। আলাপ হয়নি। ২০০১ সালে জাতীয় নির্বাচনকে সামনে রেখে উনি যেদিন প্রথম সিলেট এসেছিলেন সেদিন সিলেট রেলওয়ে স্টেশনে গুটিকয়েক নেতাকর্মীর সঙ্গে আমিও উনাকে বরণ করেছিলাম। উনি যখন নির্বাচন উপলক্ষে উনার সিলেটের বাসভবনে বিভিন্ন শ্রেণী পেশার মানুষের সঙ্গে প্রথম মতবিনিময় করেছিলেন সেদিনও উপস্থিত ছিলাম।অনেক স্মৃতি,অনেক কথা। ২০০১ সালে নির্বাচনে পরাজিত হওয়ার পর বেশিরভাগ সময় মুহিত সাহেব সিলেটে কাটাতে লাগলেন। এ সময়ই মূলত তাঁর সঙ্গে ঘনিষ্ঠ হওয়ার সুযোগ হয়েছিল। একপর্যায়ে তা পারিবারিক সম্পর্কে পরিণত হয়। তাঁর পরিবারের প্রায় সকল সদস্যের সঙ্গে পরিচয় হয়। ঘনিষ্ঠ যোগাযোগ হয়। যা এখনও অব্যাহত আছে।

সাবেক অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আবদুল মুহিতের সাথে মুক্তাদির আহমেদ মুক্ত

ফেইসবুকে মুহিত পরিবার নিয়ে যে করুণরসের সৃষ্টি করে বাহবা কুড়ানোর প্রতিযোগিতা চলছে তা দেখে আমি স্তম্ভিত। এটি কোনভাবেই বিশ্বাসযোগ্য নয়। জনাব আবুল মাল আবদুল মুহিতের ধানমন্ডিতে কোনো বাড়ী নেই। বলা হয়েছে মুহিত সাহেবের ছেলে তাঁর বাবা মন্ত্রী থাকাকালীন সময়ে উনার তৈরী বাসায় নিজের পরিবার নিয়ে থেকে অভ্যস্ত হয়ে গেছেন। তাই মুহিত সাহেবকে এই বাসায় জায়গা দিচ্ছেন না।অন্যত্র রাখতে চাচ্ছেন। তা কোনো অবস্থাতেই বিশ্বাসযোগ্য নয়। কারণ মুহিত সাহেব যতদিন মন্ত্রী ছিলেন ততদিন তাঁর ছেলে পরিবার নিয়ে বাবার সঙ্গেই থাকতেন। ধানমন্ডিতে উনার কোনো বাড়ি নেই, উনার বাসা বনানীতে। উনি মন্ত্রী হওয়ার আগে প্রায় অর্ধশতবার এই বাসায় যাওয়ার সুযোগ হয়েছে। অবসর নেওয়ার পরও একাধিকবার তাঁর বাসায় গিয়েছি। কখনো এমন পরিবেশ চোখে পড়েনি। বরং মুহিত সাহেবের পরিবারের মতো একান্নবর্তী পরিবার খুব কমই আছে। ভাই বোন সকলই প্রতিষ্ঠিত ও বয়স্ক হওয়া সত্বেও উনারা যেভাবে পারিবারিক সম্পর্ক ধরে রেখেছেন। তা প্রশংসাযোগ্য। সিলেটের ঐতিহ্যবাহী এই পরিবারের সামাজিক বন্ধন খুবই দৃঢ়। তাদের পারিবারিক আবহ আন্তরিকতাপূর্ণ। হয়তো কোনো তৃতীয় পক্ষ ফজলুল বারী ভাইকে মিথ্যা তথ্য সরবরাহ করে এমন লেখা লিখেয়েছেন। মুহিত পরিবারের সঙ্গে সম্পর্ক থাকার সুবাদে অনেকেই ফোন করে এবং ম্যাসেঞ্জারের মাধ্যমে এ বিষয়ে জানতে চাচ্ছেন।এই পরিপ্রেক্ষিতে এ লেখা।

ফজলুল বারী ভাই আমার একজন ঘনিষ্ঠ মানুষ।

একজন সাহসী প্রগতিশীল সাংবাদিক হিসেবে উনাকে অনেক শ্রদ্ধা করি। আমি একবার সরকারি সফরে অস্ট্রেলিয়া গেলে বারী ভাই আমাকে সিডনি শহরের হোটেল থেকে অনেক দূরের পথ লাকাম্বায় তাঁর বাসায় নিয়ে গিয়েছিলেন। আমাদের কয়েকজনকে সেদিন নিজ হাতে রান্না করে খাবার খাইয়েছিলেন। মধ্যরাতে সিডনি শহর ঘুরে দেখিয়ে আবার হোটেলে পৌঁছে দিয়েছিলেন। তিনি পরবর্তীতে দেশে আসলে আমার বাসায় বেড়াতে এসেছিলেন। মানবিক বারী ভাই আজগুবি তথ্যের উপর ভিত্তি করে কেনো এমন একটি লেখা লিখলেন তা বোধগম্য নয়। আর ফেইসবুকে এই লেখাটা পড়ে অনেকে নানা মন্তব্য করেছেন। কেউ কেউ অতি উৎসাহী মুহিত সাহেবের বিরুদ্ধে অশ্লীল মন্তব্য করেছেন। তিনি নাকি প্রাপ্য পেয়েছেন। সন্তানকে নাকি সঠিকভাবে মানুষ করতে পারেননি। কতকিছু। কেউ কেউ দয়ার ভাণ্ডার নিয়ে মুহিত সাহেবকে আশ্রয় দেওয়ার ঘোষণা দিচ্ছেন। একজন স্বনামধন্য মানুষকে সামাজিকভাবে হেয়প্রতিপন্ন করতে কুরুচিপূর্ণ মন্তব্য করছেন যা কোনো অবস্থাতেই সমর্থনযোগ্য নয়।

প্রত্যেক মানুষেরই ব্যক্তিগত ও পারিবারিক জীবনে সবকিছু নিজের মতো করে হয়ে ওঠে না।মুহিত সাবও এর ব্যতিক্রম নন। যারা এ পরিবারের সঙ্গে সম্পর্কিত তারা নিশ্চয়ই জানেন নানা বিষয়ে তাঁর ছেলের সঙ্গে তাঁর মতবিরোধ ছিল। রাজনৈতিক কারণে ও তাঁদের বৈষয়িক বিষয় ব্যবস্থাপনা নিয়ে মতপার্থক্যের কথা আমরা কিছুটা জানি। কারো ব্যক্তিগত বা পারিবারিক বিষয় তার অনুমতি না নিয়ে যেকোনো মাধ্যমে প্রকাশ করা উচিত নয় । তবুও অবস্থার পরিপ্রেক্ষিতে বলতে হচ্ছে – তাঁদের বনানীর বাসা ডেভোলাপার কে দেওয়া নিয়ে বাবা-ছেলের মধ্যে মতপার্থক্য ছিল। যা পরবর্তীতে পারিবারিক হস্তক্ষেপে সমাধা হয়। তিলকে তাল করে মুহিত সাহেবের মতো একজন ব্যক্তিকে তাঁর ছেলে বাসায় উঠতে দিচ্ছেন না এমন প্রচার করা খুবই দুঃখজনক। এতে একজন সম্মানী ব্যক্তির পারিবারিক জীবন অতিষ্ঠ হতে পারে । নব্বই ছুঁই ছুঁই একজন মানুষ যিনি তাঁর ছেলের সঙ্গে স্বাচ্ছন্দে অবসর জীবন ভোগ করছেন তাঁকে নিয়ে এমন কল্পকাহিনী হৃদয়বিদারক।সামাজিকভাবে একজন বিশিষ্ট মানুষকে এভাবে অপদস্ত করার নিন্দা জানানোর ভাষা আমার জানা নেই। আবুল মাল আবদুল মুহিত একজন বহুমাত্রিক ব্যক্তিত্ব।তাঁর ছেলেও একজন উচ্চ শিক্ষিত পেশাজীবি। আমার জানামতে সাহেদ মুহিত তাঁর বাবার প্রতি যতটা যত্নশীল তা অনুকরণযোগ্য। মন্ত্রী থাকা অবস্থায় এবং মন্ত্রী না থাকার পরেও বিভিন্ন সময় বাবাকে তিনি সাহচর্য দিয়ে আসছেন। অবসরকালীন সময়ে একসঙ্গে, একবাসায় বসবাস করছেন। পারিবারিক বিষয়ে যে কারো সমস্যা থাকতে পারে। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে এভাবে অপপ্রচার করা শিষ্টাচারবর্জিত। একটি সম্মানী পরিবারকে এভাবে হেয়প্রতিপন্ন করা সুস্থ মস্তিষ্কের কাজ হতে পারে না। যারা অতি উৎসাহী হয়ে এ ঘটনায় তীর্যক মন্তব্য করেছেন তাদের প্রতি ক্ষোভ প্রকাশ করছি। এ ধরণের পরনিন্দা বা পরচর্চা এক ধরনের সামাজিক অপরাধ। এগুলো সামাজিক ও পারিবারিক মূল্যবোধের ওপর আঘাত।এসব অশুভ অপতৎপরতায় কেউ যাতে বিভ্রান্ত না হন সেই অনুরোধ করছি। ফজলুল বারী ভাইকে অনুরোধ, আপনি কোন মাধ্যমে এই তথ্যটি পেলেন তা প্রকাশ করুন। হয় আপনার বক্তব্য প্রত্যাহার করুন না হয় এই পরিবারের সদস্য ও সংশ্লিষ্ট প্রশাসনিক ব্যক্তিদের প্রামাণিক বক্তব্য দিয়ে এর অস্পষ্টতা দূর করুন।

আবুল মাল আবদুল মুহিত একজন আলোকিত মানুষ। ঘোষণা দিয়ে অবসরে গিয়ে তিনি এখন লেখালেখি ও গবেষণায় সক্রিয় আছেন। এই সময় তাঁর সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন মানসিক প্রশান্তি ও শারীরিক সুস্থতা। তাঁর পরিবার নিয়ে অপপ্রচার চালিয়ে বয়স্ক এই মানুষটাকে একটা অস্বস্থির মধ্যে ফেলে দেওয়া হলো। দোষে গুনেই মানুষ। বিবেক বর্জিত সমালোচনা খুবই দুঃখজনক। যখন তিনি ছেলের সঙ্গে পুরোপুরি পারিবারিক জীবন উপভোগ করছেন তখন এ ধরণের মিথ্যা প্রচারণা আরো বেশি পীড়াদায়ক। এমনিতেই স্পষ্টবাদিতার জন্য পরিবারের ভেতরে, বাইরে অনেকেই তাঁর উপর মনঃক্ষুন্ন। অনেকের আবদার পূরণ না করায় তাঁর উপর বিক্ষুব্ধ। তাঁর মতো জ্ঞানী, সৎ, ব্যক্তিত্ববান সুপুরুষ খুব কমই আছেন। এই মানুষটির প্রতি অবিচারে খুবই মর্মাহত। শ্রদ্ধা ও ভালোবাসার মানুষ আবুল মাল আবদুল মুহিতের দীর্ঘায়ু ও সুস্থতা কামনা করছি।