নারী

0
660
প্রচ্ছদ: কাজী তামান্না তৃষার ট্র্যাপেস্টি থেকে
শারমিন আফরোজ বন্যা

শারমিন আফরোজ বন্যা: সুঁইয়ের খোঁচাটা অসহ্য লাগছে স্বপ্নার। স্যালাইনটা টেনে খুলে ফেলতে ইচ্ছা করছে ওর। কিন্তু ওর স্বামী মানুষটা ভীষণ বাজে, এটা করলে সে যে ঠিক কতটা ভয়ঙ্কর হয়ে উঠবে ধারণা করা মুশকিল। সে শুয়ে আছে হাসপাতালের ফ্লোরে। সাথে সেই বদ লোকটা ছাড়া আর কেউ নেই। আজকাল ভাইবোনরা কেউ আসে না। লোকটা খুব অপমান করেছে সবাইকে, অনেকবার। তাই ওর আশা সবাই আজকাল ছেড়েই দিয়েছে। স্বপ্না আছে একটা ঘোরের মধ্যে, মাঝে মাঝে ঠোঁট দুটো নড়ছে তার। বিড়বিড় করছে। মুখের কাছে কান নিলে শোনা যাবে সে বলছে, ‘কেন একটা বাচ্চা দিলা না আমাকে আল্লাহ? একটা বাচ্চা?…’

আবার খানিকক্ষণ পর জ্ঞান হারিয়ে ফেলছে সে। সেই সময়টা খুব অদ্ভুত। নাকের মধ্যে খুব জাল হতে থাকা চাপাতার মিষ্টি গন্ধ। ছোট্ট বারান্দা লাগোয়া টিনের চাল দিয়ে ঢাকা দেয়া রান্না ঘরের গ্যাসের চুলাটার আগুন কমায় সে। কাঠের পিঁড়িতে বসে চুলায় বলকাতে থাকা চায়ে একটা চামচ ডুবিয়ে দিয়ে নাড়তে থাকে আর শ্বাস টানে। মৃদু গন্ধটা আরও গাঢ় হয়ে চারিদিকে ছড়িয়ে পরতে থাকে। একটা ছোট্ট ট্রেতে তিনটাই কাপ আঁটে। একটা পরিস্কার ন্যাকড়া দিয়ে যত্ন করে ট্রে টা মুছে তাতে কাপ তিনটা সাজায়। ঘন দুধ দিয়ে চা টা আরেকটু জাল হয়, খুব একটু সময় নিয়ে তিনকাপ চা তৈরি করে স্বপ্না। নিজেরটা একটু বেশি, একটু বড়, মগের মতো কাপ…। চা তার নেশা! সামান্য চা। আজ তার দুজন বন্ধু এসেছে। নিজের অজান্তেই যাদের জীবনকে সে অনুসরণ করে এসেছে সারাজীবন! নিজের কোন গাঢ় বুদ্ধি নাই তার। তাই আশেপাশে যাকে ভালো লাগে, তাকেই ফলো করে চোখ বন্ধ করে। এদের কিন্তু সে ভালোবাসে। কিন্ত এদের মতো একটা জীবন তার চাই-ই চাই…। ‘কিন্তু কেন দিলে না আল্লাহ! কেন? খুব অবাস্তব কিছু তো চাই নাই! নাকি চেয়েছিলাম? হ্যাঁ, চেয়েছিলামতো। চেয়েছিলাম, স্বামী মানুষটা যেমনই হোক, তার গাড়ি বাড়ি থাকা চাই! আর যে কষ্টের জীবন ভালো লাগছিল না। একটা জীবন শুধু কী পরিশ্রম করেই কাটবে নাকি? কতো সহজে তাই একজন ডিভোর্সি লোককে বিয়ে করতে রাজি হয়ে গেলাম! গাড়ি আছে, বাড়ি আছে! শুধু শর্ত একটাই, চাকরিটা আর করা যাবে না! উফ। কি খুশিই না হয়েছিলাম!! জীবনে আর কোন কষ্ট রইল না…’।

ঘোরের মধ্যে টের পায় তার বর্তমান স্বামী কারও সাথে মোবাইলে তার চিরাচরিত ধুর্ত স্বরে কথা বলছে। সেই দিনটাও কতো স্পষ্ট, যেদিন এই লোকটা এসেছিল কয়েকজন আত্মীয় আর বন্ধু নিয়ে। তাদের পক্ষের মুরুব্বিরাও ছিলেন এবার। এবার কিন্তু স্বপ্না খুব স্বপ্ন দেখেছিল, তাদের পক্ষের মুরুব্বিরাও। লোকটার বাপের ঢাকায় পাঁচতলা বাড়ি। নিজের একটা তিন কাঁঠার প্লট। দুটা কিন্ডারগার্টেন স্কুল চালায়। আর সেই সাথে আগের ঘরের তিনজন ছেলে পিলে। ছেলেটাই এ বাড়িতে থাকে। মেয়েরা ডিভোর্সের সময় মায়ের ভাগে পরেছে…। স্বপ্নার মুরুব্বিরাও স্বপ্ন দেখেছিলেন। লোকটা বলেছিল, কিস্তি শোধ হলেই প্লটটা স্বপ্নাকে লিখে দিব। দশ লাখ টাকা কাবিন! উসুল ছিল সামান্যই… কে জানত তখন…।

লেখাপড়ায় স্বপ্না ভালো ছিল। অভাব অনটনের মধ্যেও সবগুলো দ্বিতীয় বিভাগ। একবারে ডিগ্রি পাশ করেই একটা স্কুলে চাকরি হয়ে গেল। কারণে অকারণে স্বপ্না সাজতো। তার সাজ ছিল ছিমছাম। লোহার ইস্তিরি চুলায় বসিয়ে গরম করতো, টানটান ছিল তার জামা। সাধারণ, রুচিসম্মত, কমদামি। বেতনটা পেয়ে বাবার অভাবের সংসারে বেশিটাই দিয়ে দিতে হতো। বাকিটা থেকে নিজের বিয়ের জন্য কিছু জমানো, আর একটা নতুন জামা…! সেই দুজন বান্ধবি। ওদের বাবা নাই। ওরা নিজেরা সংসারটাকে টানে। ওরা সেভিংস করে। আর ওরা খুব বই পড়ে…! স্বপ্না কিন্তু গল্পের বই পড়তে ভালো বাসতো না। তার খুব মাথা ব্যথা হতো বেশি পড়লে। তখন খুব কড়া করে এক কাপ চা লাগতো তার। তখন তার মনে হতো ‘কেন একটা বিয়ে হচ্ছে না ওর?’ একটু সুখে থাকতে ইচ্ছা করতো৷ কিসের এই চাকরি করে জীবনযাপন?

তাই চাকরি করতে হবে না শুনে কি যে খুশি হয়েছিল সে। কিন্তু অপমানটা টের পেতে পেতে অনেকগুলো ভুল হয়ে গেল জীবনে! আশ্চর্য হয়ে লক্ষ্য করলো, এরা তাকে একজন কাজের লোক এনেছে শুধু। স্বামীর কাছে সম্মান ছিল না। শ্বশুর শাশুড়ি তার মা বাবাকে আত্মীয়ের মর্যাদাই দিল না। তবু কি সুন্দর সে সমাজের কাছে সুখীর ভাব ধরে রইলো। পাড়ার সবাই দেখত স্বপ্না নাইওর আসল, টয়োটা করোলা এসে নামিয়ে দিয়ে গেল। কাতান আর গয়নায় মোড়ানো স্বপ্না অহংকারী পায়ে গাড়ি থেকে নামছে।

একটা স্বপ্ন দৃশ্য বাস্তব হয়ে গেল। অথচ সত্য গল্পটা অপমানে মাখানো। জামাইকে দাওয়াত দিয়েছিল। জামাইয়ের এসব পোষাবে না। তাই স্বপ্নাকে একাই পাঠিয়ে দিয়েছে! স্বপ্না বোকার মতো মিথ্যা জীবনটাকেই আঁকড়ে থাকতে চেয়েছিল। সম্মান না থাকুক, ধনীর পরিচয়ে বাঁচতে চেয়েছিল। সাবলম্বী হওয়ার কথা একবারও ভাবেনি। সেটা বড় পরিশ্রমের। তারচেয়ে মিথ্যা একটা সুখি দাম্পত্যই কি সে মেনে নিতে রাজি হয়নি? তাও একদিন তার স্বামীর বাড়ির গাড়ি এসে তাকে তার বাবার বাড়ি ফেলে গেল বিয়ের এক বছরের মাথায়। দোষ একটা পেয়েছিল তার! সে গর্ভধারণ করতে পারছিল না। তবু এসব কথা সে পৃথিবীর কাউকে জানাতে চায়নি… সবাই জানুক সে সুখে আছে, খুব সুখে আছে! সে-ই সবাই জানলোই! কি অপমান! কি অপমান! কি জানি কেন, স্বপ্না একটা অসত্য সুখেই সুখি হতে চেয়েছিল! নিজের দিকে তাকিয়ে স্বপ্না আর পাঁচটা সাধারণ মেয়েকেই দেখতে পায়, জীবনটাকে নিশ্চিন্ত করবার জন্য যারা একটা অসমান, মর্যাদাহীন বিবাহিত জীবনকে হাসি মুখে টেনে নিয়ে যায়।

আজ মৃত্যুর দারপ্রান্তে এসে স্বপ্নার সেই স্কুলটা চোখে ভাসে। ছোট ছোট বাচ্চাদের কলকাকলি। সমবয়সী টিচাররা সব। মাঝে মাঝেই কারণ ছাড়া হাসির শব্দ টিচার্স রুম থেকে বাইরে ছড়িয়ে পরে। স্বপ্না থাকতে থাকতেই স্কুলের মালিকানা বদল হয়েছিল। মালিক স্কুলটা তুলে দিতেই চেয়েছিলেন কোন কারণে, তখন ওরা টিচাররা শেয়ারে স্কুলটা কিনে নিয়েছিল। সবার সমান সমান না হলেও তারও একটা অংশ ছিল। বিয়েটা ঠিক হতেই, বিয়ে করে সুখি হতে চাওয়া মেয়েটা সব বেঁচেবুচে দিয়ে কিছু শাড়ি আর গয়না কিনেছিল। বোকা! বোকা! আজ মরণের মুখে এসে মনে হয় ‘আরেকবার সুযোগ যদি পাই!’ আবার পরক্ষণেই মাথাটা, বুদ্ধিটা উল্টে পাল্টে যায়! আবার বিড়বিড়, বিড়বিড়, ‘একটা বাচ্চা কেন দিলা না! একটা বাচ্চা!’

স্বপ্নার গালের কোনায় হাসির ভাজ পরে। শুকিয়ে শুটকি লাগা গালে সে ভাজ কান্নার মতো মনে হয়। চোখের সামনে দুই বান্ধবী স্পষ্ট চেহারা ভাসে। কোথাও একটা দাওয়াতে এই খট্টস দ্বিতীয় স্বামীসহ দেখা হয়েছিল। অনেকদিন পর দেখা। তিনজনে কতো কথা। হাসি আর হাসি। স্বপ্না গোল গোল গাল ফুলিয়ে বন্ধুদের বলেছিল, ‘ধুর! এই ভালো! আমাদের ছেলেটা ডাক্তারি পড়ছে! আমায় মা ডাকে না ঠিকই, কিন্তু মেনেও নিয়েছে। আমার স্বামী খুব বাচ্চা বাচ্চা করে। আমি বলি, এই তো ভালো। তোমার তো বাচ্চা আছেই তিনটা, তাও কেন বাচ্চা বাচ্চা করো?’

স্বপ্নার এখন এই হাসপাতালের ফ্লোরে শুয়ে থেকে মনে হয়, এই সবই লোকটার কোন চাল। নাহলে তিনটা বাচ্চা থাকা স্বত্তেও এই শেষ বয়সে তার আরও বাচ্চা চাইবার যুক্তি কী হতে পারে? চারটা রুম নিয়ে তাদের ফ্লাট। বাড়িতেই আরেক ফ্লাটে জা আছেন। ভাড়াটিয়ারা রয়েছে। সবার সাথে মেলামেশা তার জন্য বারণ ছিল। মায়ের বাড়ি, আত্মীয় বাড়ি, দাওয়াত পর্ব… এসব ও আস্তে আস্তে সব বন্ধ করে দিল। অথচ স্বপ্নার খুব বেশি কিছু চাওয়ার ছিল না। ফার্নিচার মুছবে, রান্না করবে, স্বামীকে নিয়ে বসে খাবে। মাঝে মাঝে কোন আপনজনের কাছে বেড়াতে যাবে। সামান্য সাজগোজ করে, আর হেসে হেসে অনেক অনেক ভালো আছে সেই গল্প করবে। শেষের দিকে সুখে থাকারও প্রয়োজন বোধ করত না, কিন্ত দুঃখে যে আছে কেউ যেন সেটা না জানে!!! বোকা! বোকা মেয়ে মানুষ!

স্বপ্না মাটিতে শুয়ে খুব অসস্তি বোধ করে। সারা মুখে, গলার ভেতরে ঘা ছড়িয়ে গেছে তার। ছেলে হওয়ানোর জন্য লোকটা কি কি সব ওষুধ এনে দিয়েছিল। তা থেকেই ইনফেকশন। অনেকদিন শক্ত খাবার খেতে পারে না। আজকাল উঠে দাঁড়াতে পারে না। ঘরদোর অগোছালো। রান্নার কি ব্যবস্থা সে জানে না। বিনা চিকিৎসায় মারাই যেত। এরমধ্যে একদিন ডাক্তার ছেলেটা বাড়ি এসে তার অবস্থা দেখে বাবার উপর ক্ষেপেছিল খুব। সে-ই স্যালাইন দিয়ে বলে গেছে অবস্থার উন্নতি না হলে হাসপাতালে নিতে। লোকটা চায় না তার জন্যে টাকা খরচ হোক। তাই অবস্থা খারাপ হতে দেখে একটা সরকারি হাসপাতালে এনেছে। কারও সাথে যোগাযোগ করেনি। সিট না পেয়ে খুশিই হয়েছে। এখন স্বপ্না মাটিতে পরে আছে। বোধহীন স্বপ্নার অদ্ভুত একটা বোধ ঠিকই কাজ করছে। হায় না জানি কারা কারা জানলো সে হাসপাতালের মাটিতে শুয়ে আছে। সবাই জেনে যাওয়ার এই দুঃখের কাছে অন্য সকল দুঃখের আর কোন মানেই থাকে না তার কাছে!

অথচ এরচেয়ে কী অনেক সুন্দর হতো না জীবনটা, যদি আরেকবার বিয়ে না বসত সে! কিন্তু সমাজকে, আপনজন, আত্মীয় বন্ধুকে বুড়ো আঙুল দেখানোর জন্য যে মেরুদন্ড লাগে তা তার কোন দিনই ছিল না। একটা স্কুলে চাকরি করে, ছোট্ট একটা বাসা ভাড়া নিয়ে, দু চারটা টিউশনি করে, মাঝে মাঝে দুয়েকটা নতুন জামা, কিছু সেভিংস করা, কিছু ঠিকঠাক বন্ধু যাকে সত্যি করে বলা যেত, ‘ভালো আছিরে, খুব ভালো না হলেও ভালো আছি!’ সন্তান না থাকাটাও কেন যে সে মেনে নিতে পারলো না? স্বামীকে খুশি করতে? নাকি নিজের বুকের ভেতরেও সন্তানের জন্যে ক্ষুধা?

দ্বিতীয় বিয়েটায় খুশি মনেই রাজি হয়েছিল সে। অন্তত এই স্বামীর সন্তানের চাহিদা থাকবে না, এটাই সে ধরে নিয়েছিল। অথচ লোকটা একটা দিনের জন্য তাকে শান্তি দেয় নাই। টেস্ট টিউব বেবির জন্যও দৌঁড়েছে। তাবিজ, ঝারফুক সব! প্রতি মুহুর্তে তাকে সে মনে করিয়ে দিয়েছে ‘তুমি অপারগ!’ মানসিক শান্তি কি জিনিস স্বপ্না জানে না। তবু একেকদিন বন্ধুদের ফোন দিত। খুব মিষ্টি করে, হেসে হেসে অনেক সুখের গল্প করতো। ইদানিং বন্ধুরাও রাগ হতো। সত্যিটা ধরে ফেলেছিল ওরা। ওকে বকা দিত। সন্তানের আশা ছেড়ে দিয়ে, মনটাকে চাঙা রাখার জন্যে আবার চাকরিতে জয়েন করতে বলতো। কিন্তু স্বপ্নার স্বামী যে কিছুতেই রাজি হয় না। আরেকবার সেপারেশনের মতো সাহস তার নাই। মা বাবার জোর নাই। ভাই বোনেরাও যার যার জীবন নিয়ে ব্যস্ত। কারো সংসারে দু বেলার মেহমানদারি ঠিক আছে, কিন্ত একেবারে থাকবার মতো জায়গা কি কেউ দেবে? সেও কি ভালো থাকতে পারবে অন্যের সংসারে?

স্বপ্না বোঝে তার সমস্যা সে নিজেই। এই যে তার বর্তমান স্বামী, সে যা করছে তার সাথে, নারী নির্যাতন কেস হতে পারে অবলীলায়। কিন্ত সে তো কল্পনাতেও ভাবতে পারে না, সবাই সত্যটা জেনে গেছে!! সাধারণ আর পাঁচটা মেয়ের চেয়ে তার পায়ের জোর বেশিই ছিল। তার সার্টিফিকেট রয়েছে, চাকরির অভিজ্ঞতা আছে, আগের কাবিনের কিছু টাকা আছে। শুধু তার সাহস নাই। মনোবল নাই। সে কেমন পাগল পাগল। সে কেমন অলস। নারীরা কী এমনই হয়? কতোভাগ নারী আজো এমন, তা কোনদিনই বের করা সম্ভব নয়। কারণ স্বপ্না এই ঘোরের মধ্যে হাসপাতালের ফ্লোরে শুয়ে থেকেও টের পায়, বাড়ি ফিরে যেতে পারলেই সে এই পুরো ঘটনাটার সাথে কতো কল্পনাকে মিশিয়ে সবার কাছে সুখের একটা বানানো গল্প বলবে…। নিষ্ঠুর সত্যগুলো তাই অজানাই থেকে যাবে সবার!