প্রধানমন্ত্রীর অনুষ্ঠানের মজুরী পাননি শ্রমিকরা

0
562
২০১৯ সালের ৫ ডিসেম্বর প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা 'সুবর্ণ ভবন' উদ্বোধন করেন। এই অনুষ্ঠানে কাজ করা শ্রমিকরা তাদের পাওনা মজুরী পাননি সাড়ে ৬ মাসেও

প্রধানমন্ত্রীর অনুষ্ঠান আয়োজনে কাজ করা দেড় শতাধিক শ্রমিক তাদের পাওনা মজুরি পাননি সাড়ে ৬ মাসেও। লকডাউনের কারণে এসব দিন মজুরদের পরিবার অর্ধাহার-অনাহারে দিন কাটিয়েছেন। সরকারি, বেসরকারি বা ব্যক্তি পর্যায় থেকে পাওয়া সহায়তা নিয়ে তাদের দিন কেটেছে অর্ধাহার-অনাহারে। অথচ এদের প্রত্যেকেই কয়েক হাজার টাকার মজুরি পাওনা রয়েছেন। সমাজকল্যাণ মন্ত্রণালয় ও জাতীয় প্রতিবন্ধী উন্নয়ন ফাউন্ডেশেনের রশি টানাটানিতে এই পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে।

প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা গত বছরের ৫ ডিসেম্বর গিয়েছিলেন জাতীয় প্রতিবন্ধী ফাউন্ডেশেনে। সেখানে তিনি ‘সুবর্ণ ভবন’ কমপ্লেক্সের উদ্বোধন করেন এবং জাতীয় ও আন্তর্জাতিক প্রতিবন্ধী দিবসের অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি হিসেবে অংশ নেন।

অনুষ্ঠানের ব্র্যান্ডিং, মঞ্চ, গেইট ও প্যান্ডেল নির্মাণসহ আনুষাঙ্গিক কাজের দায়িত্ব দেয়া হয় কিংবদন্তী মিডিয়াকে। এই কাজে অংশ নেন দেড় শতাধিক দিনমজুর। সমাজকল্যাণ মন্ত্রণালয়ের প্রতিবন্ধী শাখা এবং প্রতিবন্ধী ফাউন্ডেশনের কল্যাণে এই দিন মজুররা ৬ মাস ১৩ দিন পরও তাদের মজুরির সম্পূর্ণ টাকা পাননি। আদৌ পাবেন কিনা সে নিয়েও সংশয় তৈরি হয়েছে। বিশেষত ৩০ জুন ২০১৯-২০২০ অর্থবছর শেষ হয়ে গেলে এই টাকা পাওয়ার সম্ভাবনা নেই। সেই ক্ষেত্রে উচ্চ আদালতের দ্বারস্থ হওয়া ছাড়া টাকা পাওয়ার কোন সম্ভাবনাই থাকবে না।

অথচ সেই অনুষ্ঠানের মাত্র কয়েকদিন আগে তড়িঘড়ি করে আরেকটি কাজের ব্যবস্থা করা হয়। সমাজকল্যাণ মন্ত্রণালয়ের সে সময়কার প্রতিমন্ত্রী শরীফ আহমেদ-এর শ্যালকের প্রতিষ্ঠান ‘আরশীনগর’-এর জন্য। প্রতিবন্ধী দিবসের বোর্ড ও প্ল্যাকার্ড তৈরি এবং সেগুলো সচিবালয় থেকে মিরপুর ১৪ নম্বর সেকশন পর্যন্ত রাস্তায় লাগানোর দায়িত্ব দেয়া হয় তাদের।

অনুষ্ঠান শেষ হওয়ার পরপরই তাদের বিলের বড় অংশই পরিশোধ করা হয়। পরে বাকি টাকাও পরিশোধ করা হয়েছে বলে জানা যায় আরশীনগর সংশ্লিষ্টদের কাছ থেকে।

মন্ত্রণালয়ের অতিরিক্ত সচিব (প্রতিষ্ঠান ও প্রতিবন্ধী বিষয়ক) মোহাম্মদ ইসমাইল কয়েক দফায় কিংবদন্তীর পাওয়া কাজ আরশীনগরকে দেয়ার জন্য বলেন। সে সময় সুবর্ণ ভবন কমপ্লেক্স নির্মাণ প্রকল্পের পরিচালক (যুগ্ম-সচিব) মো. খোরশেদ আলম জানান, কিংবদন্তীকে নিয়ম অনুযায়ী ২০১৮ সালে কাজটি বরাদ্দ দেয়া হয়।

উল্লেখ্য, কিংবদন্তী মিডিয়াকে মঞ্চ, প্যান্ডেল ও তোরণ নির্মাণ, আমন্ত্রণপত্র ছাপানো, অনুষ্ঠানের ৪টি ডিজিটাল ডিসপ্লে, লাইট, সাউন্ড, ভিডিও ডকুমেন্টেশন, ব্যাকড্রপ, ফ্যান, পোর্টেবল এসি, কমপ্লেক্সের শ্বেত পাথরের ফলক তৈরির কাজ দেয়া হয়। খামসহ আমন্ত্রণপত্র ছাপানোর কাজটি শেষ মুহূর্তে বিনা নোটিশে বাতিল করা হয়। কিংবদন্তী মিডিয়ার পক্ষ থেকে জানানো হয়, মন্ত্রণালয় ও ফাউন্ডেশনের পক্ষ থেকে অন্তত পাঁচ বার কার্ডের ডিজাইন পরিবর্তন করা হয়। এ কাজে প্রতিষ্ঠানটি গ্রাফিক ডিজাইনারকে যে পেমেন্ট দেয় তা মৌখিকভাবে কাজটি বাতিল হওয়ার কারণে বিল আকারে পাওয়া যায়নি।

জানা গেছে, অনুষ্ঠানের ৫ দিন আগে মঞ্চ ও প্যান্ডেল নির্মাণের জন্য ফাউন্ডেশনের মাঠ কিংবদন্তী মিডিয়ার কাছে হস্তান্তর করা হয়।

এই পাঁচ দিনের মধ্যে প্রধানমন্ত্রীর অনুষ্ঠানের বিশাল মঞ্চ ও প্যান্ডেল নির্মাণের কাজ সম্পন্ন করতে অতিরিক্ত শ্রমিক নিয়োগ করতে হয়। কার্যাদেশ অনুযায়ী প্রথমে আড়াই ফুট উচ্চতার মঞ্চ নির্মাণ করা হয়। অনুষ্ঠানের ৩ দিন আগে প্রধানমন্ত্রীর নিরাপত্তায় নিয়োজিত স্পেশাল সিকিউরিটি ফোর্স (এসএসএফ)-এর নির্দেশনা অনুযায়ী কয়েকশ’ বাঁশ ও কাঁঠের খুঁটি তুলে নতুন করে সাড়ে ৪ ফুট উচ্চতার মঞ্চ নির্মাণ করতে হয়।

কিংবদন্তী মিডিয়ার স্বত্বাধিকারী বিপ্লব রহমান জানান, কার্যাদেশ অনুযায়ী যে পরিমাণ কাজ ছিল শেষ পর্যন্ত কাজের পরিধি অন্তত পাঁচ গুন বেড়ে যায় এসএসএফ-এর নির্দেশনা অনুযায়ী। এমনকি অনুষ্ঠানের আগের রাতে ওয়াকওয়ে হিসেবে ব্যবহারের জন্য ৪০ ফুট উচ্চতার ২০ ফুট প্রস্থ্যের ৩০০ ফুট লম্বা আরেকটি ছোট প্যান্ডেল তৈরির নির্দেশনা পাওয়া যায়। যে পথে প্রধানমন্ত্রী পায়ে হেঁটে কমপ্লেক্স উদ্বোধন করতে যাবেন। সেই ৩০০ ফুট পথে লাল গালিচা বিছিয়ে দিতে বলা হয়। মধ্যরাতে বায়তুল মোকাররম এলাকার দোকান খোলানোর ব্যবস্থা করে লাল কার্পেট কিনে আনতে হয়। এছাড়া প্যান্ডেলের দুই পাশের উচ্চতা হওয়ার কথা ছিল ২০ ফুট। যা পরে নির্মাণ করতে হয় ৪০ ফুট উচ্চতার।

বিপ্লব রহমান জানান, সমাজকল্যাণ মন্ত্রী নুরুজ্জামান আহমেদ, মন্ত্রণালয়ের তৎকালীণ প্রতিমন্ত্রী শরীফ আহমেদ, মন্ত্রণালয়ের তৎকালীণ সিনিয়র সচিব জুয়েনা আজিজ, অতিরিক্ত সচিব (প্রতিষ্ঠান ও প্রতিবন্ধী বিষয়ক) মোহাম্মদ ইসমাইল, জাতীয় প্রতিবন্ধী উন্নয়ন ফাউন্ডেশনের ব্যবস্থাপনা পরিচালক (অতিরিক্ত সচিব) মাহমুদা মিন আরা এবং প্রকল্প পরিচালক (যুগ্ম-সচিব) মোহাম্মদ খোরশেদ আলম প্রতিবারই বলেছেন এসএসএফ-এর নির্দেশনা অনুযায়ী সুন্দরভাবে কাজ শেষ করতে হবে। বিলের ব্যাপারে দুশ্চিন্তা না করে তারা কাজ চালিয়ে যেতে বলেন।

বিপ্লব রহমান বলেন, অনুষ্ঠান ছিল রোববারে। এসএসএফ-এর নির্দেশনা অনুযায়ী কাজের পরিধি বাড়তে থাকে বৃহস্পতিবার রাত থেকে। মন্ত্রণালয় ও ফাউন্ডেশনের অফিসে এ সময় সাপ্তাহিক বন্ধ ছিল। তাই বাড়তি কাজের ওয়ার্ক অর্ডার নেয়ার সুযোগ ছিল না। তাছাড়া প্রধানমন্ত্রীর নিরাপত্তা ব্যবস্থা নিশ্চিদ্র করতে এসএসএফ-এর চাহিদা অনুযায়ী মন্ত্রণালয় ও ফাউন্ডেশনের শীর্ষ কর্তাদের মৌখিক নির্দেশে কাজ করতে হয়েছে, সে পরিস্থিতিতে নতুন করে অতিরিক্ত কাজের জন্য কার্যাদেশ নেয়া বা চাওয়ার মত সময়, পরিবেশ ও পরিস্থিতি ছিল না।

শ্রমিকদের মজুরি এখনও কেন দেয়া হচ্ছে না এমন প্রশ্নের জবাবে বিপ্লব রহমান জানান, কার্যাদেশের বাইরে অতিরিক্ত কাজের বিল গত ডিসেম্বরেই দেয়া হয়েছে। সেই বিল প্রকল্প পরিচালক (যুগ্ম সচিব) খোরশেদ আলম এবং ফাউন্ডেশনের প্রশাসন ও অর্থ বিভাগের পরিচালক (যুগ্ম সচিব) শেখ হামিম হাসান বৈঠক করে নোট আকারে মন্ত্রণালয়ে পাঠান। এই নোটের ভিত্তিতে মন্ত্রণালয় ৩৩ লাখ টাকার বিপরীতে ৭ লাখ টাকা ছাড় করে।

বিপ্লব রহমান বলেন, মন্ত্রণালয় ৭ লাখ টাকা ছাড় করলেও ফাউন্ডেশন বিলের ট্যাক্সের অংশ এবং ভিডিও ডকুমেন্টেশনের বিলের টাকা কেটি রেখে সাড়ে ৪ লাখ (৪ লাখ ৫৬ হাজার) টাকার চেক দেয়। এই টাকার একটি অংশ ডেকোরেটরের শ্রমিকদের এবং বাকি অংশ দিয়ে কাজের সাথে যুক্ত অন্যদের পারিশ্রমিকের একটি অংশ পরিশোধ করা হয়। বিল পাওয়া না যাওয়ায় শ্রমিকদের মূল অংশটাই পরিশোধ করা যায়নি।

এ বিষয়ে ফাউন্ডেশনের প্রশাসন ও অর্থ বিভাগের পরিচালক শেখ হামিম হাসান ও প্রকল্প পরিচালক খোরশেদ আলমের সাথে আর্ট নিউজের পক্ষ থেকে যোগাযোগ করা হয়।

প্রকল্প পরিচালক জানান, বিষয়টি মন্ত্রণালয়ে আছে। অর্থ ছাড় হলেই বিল পরিশোধ করা হবে। তবে সবশেষ গত ১৬ জুন প্রকল্প পরিচালক জানান, এই বিল ছাড় হওয়ার সম্ভাবনা তিনি দেখছেন না। কারণ হিসেবে অতিরিক্ত সচিব ইসমাইল হোসেনের অনাগ্রহের বিষয়ে ইঙ্গিত দেন তিনি।

অন্য দিকে, ফাউন্ডেশনের প্রশাসন ও অর্থ বিভাগের পরিচালক শেখ হামিম হাসান বলেন, তার জানা মতে কিংবদন্তী মিডিয়ার পুরো বিল পরিশোধ করা হয়েছে। এ বিষয়ে তিনি এর বেশি কিছু জানেন না বলে জানান। ৩৩ লাখ টাকার বিলের বিষয়ে তিনি মন্তব্য করতে রাজি হননি। তবে যে সাড়ে ৪ লাখ টাকা দেয়া হয়েছে সেটি কোন খাতে দেয়া হলো, এমন প্রশ্নের জবাবও তিনি দেননি।

মন্ত্রণালয়ের বাজেট শাখায় যোগাযোগ করে জানা গেছে, এই খাতে দেয়ার মত বাজেট নেই। ভবিষ্যতে বাজেট বরাদ্দ দেয়া হলে তখন বিষয়টি সুরাহা হবে।

যারা এই কাজে যুক্ত ছিলেন তারা প্রশ্ন তুলেছেন প্রধানমন্ত্রীর অনুষ্ঠান আয়োজনে যদি বাজেট না থাকে তাহলে এত বড় অনুষ্ঠান আয়োজনের কি প্রয়োজন ছিল।

বাস্তবতা হচ্ছে এই, মন্ত্রণালয় ও ফাউন্ডেশনের শীর্ষ কর্মকর্তাদের কারণে দেড় শতাধিক শ্রমিক তাদের প্রাপ্য মজুরি সাড়ে ৭ মাসেও পাননি। করোনা ভাইরাসের সংক্রমণ ঠেকাতে সাধারণ ছুটি ঘোষণার পর থেকে তারা প্রত্যেকে বেকার রয়েছেন। এই মুহূর্তে তারা প্রত্যেকেই ত্রাণের ওপর নির্ভরশীল। প্রাপ্য মজুরি পেলে আরও কিছুদিন তারা অন্তত দু’বেলা পেট ভরে ভাত খেতে পারতেন। অথচ দেড় শতাধিক দিনমজুর এই করোনাকালে মানবেতর জীবনযাপন করছেন।

এ বিষয়ে ডেকোরেটর প্রতিষ্ঠানের মালিক ফারুক জানান, সীমিত আকারে সব খুলে দেয়ার পর অন্যান্য শ্রমিকরা কাজে ফিরলেও ডেকোরেটরের সাথে যুক্ত শ্রমিকরা এখনও বেকার রয়েছেন। স্বাস্থ্যবিধির কারণে সব অনুষ্ঠান বন্ধ থাকায় ডেকোরেটর শ্রমিকদের কোন কাজ নেই। ফলে তারা প্রত্যেকে মানবেতর জীবন যাপন করছেন। কিংবদন্তী মিডিয়ার স্বত্বাধিকারী বিপ্লব রহমান মানবিক কারণে এই বিলটি দ্রুত ছাড় করার জন্য মন্ত্রণালয়ের প্রতি অনুরোধ জানিয়েছেন।