প্রসূতি

0
488
শারমিন আফরোজ বন্যা

শারমিন আফরোজ বন্যা: আনন্দের মনে হয় তলপেটের ভেতর রক্ত বা পানির মধ্যে ভাসতে থাকা বাচ্চাটা মোচড় দেয় বেরিয়ে আসার জন্য। নাড়িভুড়ি ছিড়ে আসার অনুভূতি। প্রায় চারঘন্টা সে দাঁতে ঠোঁট চেপে ব্যথা সহ্য করছে। শুরুর দিকে ব্যথাটা থেমে থেমে আসছিল। ব্যথাটা যখন আসে, নাভীর নিচের অংশের, তলপেটের ভেতর পেঁকে যাওয়া ফোঁড়ার মতো টনটন করে। তারপর পেশিগুলো সংকুচিত হয়, সামনের পেশির টানে ব্যথাটা কোমর বেয়ে ছড়িয়ে যায় পিছনে। মুহুর্তের জন্য তার মনে হয় দমটা বেড়িয়ে যাবে এখনি। কিছুক্ষণ পরেই আবার ব্যথাটা নেই হয়ে যায়। তখন একটু আগের ব্যথাটা ছিল বলে মনেই থাকে না।

ঘামে ভিজে থাকা সারা গায়ে সিলিং ফ্যানের বাতাস একটা আরামের অনুভূতি তৈরি করে শরীরে। মনে হয় ভেজা ন্যাকড়া দিয়ে গা মুছে দিলে আরেকটু শান্তি হতো। পরক্ষণেই ব্যথাটা ফিরে আসে। আরও তীব্র হয়ে। যেন সত্যিই কিছু একটা ছিঁড়ে যায় লোয়ার অ্যাবডোমেনে। সে তার পা দুটোকে পেটের কাছে ভাজ করে, যেন থাই দুটো তলপেট চেপে ধরলে ব্যথাটা কমবে।

ঘোলা চোখে টের পায় নার্স এসে দেখে যায়, পাশেই বসে থাকা শাশুড়ী মাকে কিছু একটা বলে। অপারেশন করতে চায় কি তারা? সে তো বারবার বলেছে, শেষ পর্যন্ত যেন নর্মাল ডেলিভারির চেষ্টা করা হয়! প্রেগনেন্সির শুরুর দিকেই যখন ব্লাড প্রেশার খুব হাই হচ্ছিল, ডাক্তার শুনে বলেছিলেন এমনটা হওয়া স্বাভাবিক। তারপর ওষুধ দিলেন, আনন্দ সহজভাবে মেনে নিতে পারেনি। ছোট একটা রক্তপিন্ডের জন্যেও যে এতো মায়া কোথা থেকে আসে!

তার ডাক্তারি না জানা মন বাচ্চার বিপদের ভয় পেয়েছিল। তারপর প্রেগনেন্সি নিয়ে যতো পড়েছে, নিজের মায়ের জন্য, শ্বাশুড়ির জন্য, পৃথিবীর সব মায়েদের জন্য শ্রদ্ধায় নুয়ে এসেছে মাথা।

একটা ২০১৭ সালের ডাটায় সে দেখেছিল পৃথিবীতে প্রতিদিন ৮৩০ জন নারী মারা যান গর্ভধারণজনিত নানা কারণে। এটি সম্ভবত বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা’র তথ্য ছিল। কত রকম ঝুঁকি! শুধু একটা প্রেগনেন্সি পিরিয়ডে একজন মা তার গর্ভাশয়ে যে পরিমাণ অ্যাস্ট্রোজেন হরমোন তৈরি করে তা তার সারাজীবনে স্বাভাবিক নিয়মে তৈরি হরমোনের পরিমানের চেয়েও বেশি। এর প্রভাব গর্ভকালে শরীর ও মনের ওপর পরে। যার অনেকগুলোর স্হায়ী প্রভাব রয়ে যায় পরবর্তী জীবনেও।

ব্যথাটা এখন নাই! তবুও সারা শরীর নিস্তেজ।

তীব্র ব্যথা।

গরম।

ঘাম।

ব্যথাহীনতা।

ফ্যানের একটা মৃদু ঘরঘর শব্দ।

ঘামের গায়ে বাতাস।

একটা ঘোরের মধ্যে সে দেখে একটা ফুটবলের মতো সে ডানে বামে দুলে দুলে হেঁটে চলছে অফিসের করিডোর দিয়ে, নিজের রুমের দিকে। চলতে চলতে সে ঈশিকাকে পার হয়। ঈশিকা একটু থেমে সালাম দিয়ে জানতে চায়, ‘কেমন আছেন এখন, ম্যাডাম?’

কি মিষ্টি লাগছে ঈশিকাকে। অ্যাসিস্ট্যান্ট সেক্রেটারি হিসাবে জয়েন করেছে এ বছর। পাতলা, ছিপছিপে, শ্যামবরণ চৌকষ একজন নারী। এই দৃশ্য অস্পষ্ট হয়ে গিয়ে আনন্দকে নিয়ে যায় নিজের অতীতে। ইশিকার চেয়ে আরও আকর্ষণীয় এক তরুণী, বুদ্ধিদীপ্ত, সহজ, অমায়িক…! আজ কেমন মাছের মতো সাতার কাটছে স্থলে!

এই সাতরে হাঁটার কারণটা জেনেও সে দারুণ বিস্মিত হয়েছিল। ও ভীষণ আশ্চর্য হয়েছিল এটা জেনে যে মানুষের এই যে দৈহিক গঠন, পৃথিবীর বুকে মধ্যাকর্ষণ শক্তির সাথে ব্যালেন্স করে তৈরি… যেন এটা ডানে বামে, সামনে বা পেছনে ওজনের কম বেশির কারণে ভারসাম্য না হারিয়ে ফেলে। গর্ভকালে একজন মায়ের যেমন মেটাবোলিজম রেট বেড়ে যায়, খাবারের পরিমাণ বাড়ে, স্বাস্থ্য বাড়ে বাচ্চা আর মা দু’জনের। মায়ের শরীরে বাড়তে থাকা বাচ্চাটা নিজের জন্য জায়গা চায়। মা তার পেটটাকে বড় করে দেন। আর সেই সাথে নিজের বুকে জমাতে শুরু করেন নবজাতকের জন্য খাবার। মা তখন দেহের সামনের দিকের এই বাড়তি ওজন নিয়ে আগের পদক্ষেপের গতি বা দিকে হাঁটবার ক্ষমতাই রাখেন না। পৃথিবীর মধ্যাকর্ষণ শক্তি তাকে সামনের দিকে টানে। নিজেকে ব্যালেন্স করতে সে দেহটাকে পিছনদিকে ঠেলে দেয় নিজের অজান্তে। পরে যাওয়া ঠেকাতে ডানে বামে দুলে দুলে হাঁটেন।

আনন্দর নিজের ওজন ছিল ৫০/৫২ কেজি। ৫ ফিট ২ ইঞ্চি উচ্চতার মানুষ সে। ছিপছিপে, স্মার্ট। বরাবর মোটা মানুষ দেখলেই, সে চেনা হোক বা অচেনা, আনন্দ বলতো ‘মোটা কমাও! বেশি স্বাস্থ্য রোগ ডেকে আনে।’ সেই আনন্দের ওজন আজ ৬২ কেজি। ডানে বামে দুলে দুলে হাঁটে। খুব খেয়েছে সে এ ক’মাস। শুরুর দু’মাস কিছুই খেতে পারত না। একটু খেলেই কমোড ভরে বমি করতো। কি অসহ্য সে সময়টা! ঘুম ভেঙেই গা গুলিয়ে ওঠা। পেস্টের গন্ধে বমি হতো, পেটে তো কোন খাবার নাই। নীলচে পিত পানি বেরিয়ে আসত গলা চিরে। তারপর ধীরে ধীরে রুচি ফিরলো। কিন্তু খেতে শুরু করতেই হাই ব্লাড প্রেশার।

ডাক্তার বলেছিলেন, খাওয়া চলুক। ওষুধ দিচ্ছি। কিন্তু প্রেশারটা কিছুতেই কন্ট্রোল হলো না পুরোটা সময় ধরেই। খুব কষ্ট! অফিস করেছে এ নিয়েই। মেটারনিটি লিভ টা পুরোটাই বাচ্চাটার জন্য রাখতে চেয়েছিল। কিন্তু শেষ পর্যন্ত আগেই ছুটি নিতে হলো। কি ভালো একটা পোস্টিং হয়েছিল কন্সিভ করবার আগে আগেই। খুব সুনাম তার অফিসে। সরকারি চাকরির নানান জটিলতা থেকে নিজেকে বাঁচিয়ে সাবধানে চলা একজন সৎ, দক্ষ ও পরিশ্রমী অফিসার সে। তার উর্ধ্বতন কর্মকর্তারা তার প্রতি সন্তুষ্ট। তাকে স্নেহ করেন। এই স্নেহ সে মেয়ে বলে পায় না, বরং চমৎকারভাবে কাজগুলো বুঝে ফেলে এবং তা নিয়মের মধ্যে রেখেই কিভাবে বের করে নিতে হবে সেটা সে পারে। কন্সিভ করবার পরও তার ইচ্ছা ছিল সে পুরো দমে ন’মাসই কাজ করবে। একেবার এক্সপেকটিং ডেলিভারি ডেটের এক সপ্তাহ আগে ছুটিতে যাবে।

কিন্তু শুরু থেকেই দেখা দিল নানা জটিলতা। খেতে না পারা দিয়ে শুরু। এরপর মাঝে মাঝে হাল্কা ব্লিডিং হতে শুরু হলো। আল্ট্রাসনোতে দেখা গেল ইউটেরাসে দুটো সিস্ট বড় হচ্ছে বাচ্চার পাশাপাশি। শুনে মাথায় আকাশ ভেঙে পরেছিল। বাচ্চার সাথে সাথে এদুটোও বাড়বে। বাচ্চাটা তাহলে জায়গাইতো পাবে না। ডাক্তার সম্ভব হলে বেড রেস্টে চলে যেতে বলেছিলেন তাকে। কি অদ্ভুত দোটানা। ক্যারিয়ার নিয়ে তার যেমন আজীবন লালিত স্বপ্ন বা সিরিয়াসনেস, একই রকম মা হওয়ার ব্যাপারেও তার এক অদ্ভুত মায়া। বাচ্চা তার কাছে একটা রেস্পন্সিবিলিটি। পৃথিবীতে এনে তার সঠিক লালনপালন করতে না পারলে, তার মনে হয় তারচেয়ে বাচ্চাগুলোকে পৃথিবীতে না আনাটাই ভালো।

আজ সে কঠিন প্রশ্নের মুখোমুখি। ক্যারিয়ার, নাকি সন্তানের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা! তবুও নেই নেই করেও ছুটিটা নেয়নি সে। সাবধানে চলেছে। কিন্তু একেবারে শেষ রক্ষা হলো না। সাত মাসের পর ডাক্তার আর রিস্ক নিতে না করলেন। ছুটিতে আসার পর প্রথম প্রথম অফিসে নিজের জায়গাটার জন্য খুব খারাপ লাগত। রোহান অফিসের জন্য রেডি হতো। ওর মনটা খারাপ হয়ে যেত…!

এই যে গ্যাপ, অনেকগুলো মাস পরে কাজের জায়গায় ফিরে যাওয়া। নতুন করে নিজেকে প্রফেশনাল করে তোলা, বাসায় রেখে যাওয়া বাচ্চাটা, নিজের শরীরের ক্ষয়টাকে বা পরিবর্তন টাকে মেনে নেওয়া, সেটাকে আগের জায়গায় ফিরিয়ে নেওয়া…! হাজার হাজার বছর ধরে নারীরা কতো সহজে, কতো স্বাভাবিকভাবে মেনে নিয়েছে এটা, ভালোবেসেই! আনন্দ বিয়ের আগে পাক্কা দু’বছর চুটিয়ে প্রেম করেছে রোহানের সাথে। পিএটিসি’র চারমাসের রেসিডেন্সিয়াল ট্রেনিং-এ রোহানের সাথে পরিচয়। ওই ছিল সেই গ্রুপে একমাত্র মেয়ে, যে এনগেজড নয় তখনো। তো ব্যাচের অবিবাহিত সবার কাছে সে তখন সবচেয়ে আকর্ষণীয়। সবাই মজা করে, আনন্দকে একজন আরেকজনকে নিয়ে ক্ষ্যাপায়, অথচ ব্যবহারে স্পষ্ট হয়ে ওঠে, কথাটা নিজের জন্যেই বলা। যারা বিবাহিত, তারাও শালা বা সম্মুন্ধি বা আত্মীয় বন্ধুর জন্যে বিয়ের ঘটকালি করতে চায়।

আনন্দ বরাবরই ঝলমলে। সহজ। বুদ্ধিমান। সে সবার সাথে সম্মান বজায় রেখে মজা করে। মজা করতে করতেই একসময় খেয়াল করে সে ডাইনিং এ রোহানের পাশে, ক্লাসে বা বিকালের এক্সারসাইজে রোহানের গ্রুপে। সকালে ঘুম ভেঙে প্রথমেই ভাবছে রোহান উঠতে পেরেছে? একটা কবিতা পড়তে পড়তে ভালো লাগলে ফেসবুকে পোস্ট দিয়ে বারবার নোটিফিকেশন চেক করছে রোহান লাইক দিল কিনা, মন্তব্য করেছে কি কোনো…!

তাদের ফিল্ড ট্রিপ ছিল জাফলং-এ। সেখানে পৌঁছে আনন্দ নিজের রাশ টেনেছিল। খুব খেয়াল করে নিজের সময়কে ভাগ করছিল। সব জটলায় বেছে বেছে রোহানের পাশেই যেন না থাকে খেয়াল রাখছিল। আবার এভয়েড করছে এমনটাও যেন না বোধ হয়। মন চাইলেও বারবার চোখে চোখে রোহানকে খোঁজা বন্ধ রেখেছিল এবং তখন বিস্মিত হয়ে লক্ষ্য করল তার কিছুই ভালো লাগছে না। চমৎকার স্ফটিকস্বচ্ছ জলের নীচের পাথরগুলোতে পা ডুবিয়ে দাঁড়িয়ে থেকে হঠাৎ সে খেয়াল করলো সে একা দাঁড়িয়ে। কখন সবার অলক্ষ্যে দলছুট হয়েছে তা সে নিজেও জানে না।

তার চোখ বেয়ে টপটপ করে গড়িয়ে নামা কয়েক ফোঁটা জল পায়ের নীচের জলে মেশে। চোখের জল সে হাতের চেটোয় মুছতে গিয়েও মুছল না, নামতে দিল। উপরের সাদা-নীল আকাশ পায়ের নীচের পানিতেও ছায়া ফেলেছিল। সেই পানিতে পা ডোবানো আনন্দের পরনেও গাড় নীল জামা, সাদা ওড়নাটা বাতাসে পতপত উড়ছে। ট্রেনিং শেষে আনন্দ বাড়ি ফিরে এসে নিজের ঘরে একলা হতেই আরও স্পষ্ট হয়েছিল নিজের কাছে। রোহান তাকে পছন্দ করে, কিন্তু সেটা কেবল মানুষ হিসাবে আরেকজন মানুষকে বা বন্ধু হিসাবে বন্ধুকে! আনন্দর নিজের পছন্দটা সেরকম নয়, আনন্দ টের পায়। সে বুঝতে পারে রোহানের পছন্দ অপছন্দগুলোর সাথে মিল তাকে প্রভাবিত করেছে। অবচেতনেই তার মন হিসাব কষেছে, রোহান জীবনসঙ্গী হলে সে সুখী হবে। আজ আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে তার নারীবাদী মন তাকে প্রশ্ন করে, ‘তুমি কেন রোহানের প্রস্তাবের জন্য অপেক্ষা করছ? মেয়ে বলে?’ ব্যাপারটা তা নয়, আনন্দ জানে। এটা এক অদ্ভূত আবেগ। তার মনে হয়, এই একই অনুভূতি ছেলেদেরও হয় নিশ্চয়ই! কত প্রশ্ন! রোহান কি অন্য কাউকে ভালোবাসে? অন্য কাউকে যদি ভালো নাও বাসে, সে কি রোহানের মনের মতো? কিন্তু সব কিছু ছাপিয়ে তার মনে হয়, সত্যটা তার জানা দরকার। আনন্দ একটা মেসেজ দিয়েছিল, ‘একটা কথা জানার ছিল। বিকালে কি ফ্রি আছো?’

তারপর দু’বছরের প্রেম। বিয়ে হয়েছে তাও প্রায় তিন বছর হতে চললো। এরমধ্যে দুজনেই ক্যারিয়ারে এবং সংসারে লেগে থেকেছে সমানতালে। তাদের সংসারে কোন কাজ পুরুষ বা নারীর কাজ বলে বিভক্ত নয়। বরং যে ফ্রি আছে সে করে ফেলেছে জমে থাকা কাজ, সেটা হোক বাসন মাজা, বাথরুম ধোয়া বা চিকেন কোরমা কি ডাল চচ্চরি রাধা! কতদিন আনন্দের হয়ত কোন মিটিং থেকেছে, রোহান হয়ত সেদিন আগেই ফিরে এসেছে। রোহান রাতের ডিনার রেডি করেছে। হয়ত রোজার সময়, দৌঁড়ে এসে ওজু করে সাজানো ইফতারের টেবিলে বসে গেছে আনন্দ। রোহান প্লেটে প্লেটে ইফতার সার্ভ করা, শরবত তৈরি করা, ফলটল কাটা… শুধু কন্সিভ করার পর, আনন্দ আর রোহান দুজনেই প্রথম অনুভব করেছিল যে ‘নারী আর পুরুষ সম্পূর্ণ আলাদা দুটো সত্ত্বা! ভীষণ স্বতন্ত্র!’ সমান, ভালো-মন্দ বা বড়-ছোট তুলনার কোন সুযোগই রাখেনি সৃষ্টিকর্তা!

পৃথিবীর সব গ্রোথ থেমে যাবে যদি নারীরা বংশবৃদ্ধির ধারক হতে না চায়। হ্যা, টিউবে বেবি তো আজকাল হচ্ছেই। আর অনেক উন্নত দেশে, শুধু ক্যারিয়ারের কথা ভেবে অনেক নারী গর্ভধারণে পিছিয়েও থাকছে, একথা সত্য। কিন্তু সেটা শতকরা কতজন? একটা শিশুর গর্ভে বৃদ্ধি আর প্রাকৃতিক পদ্ধতির প্রসব শিশুটিকে অধিক অভিযোজন ক্ষমতা সম্পন্নতো করেই, আনন্দ আরও অবাক হয়েছিল এটা জেনে যে, গর্ভাবস্থায় প্রসবনালীতে একধরনের ব্যাকটেরিয়া তৈরি হয়, প্রসবনালী দিয়ে জন্মানো শিশু এই ব্যাকটেরিয়া প্রসবের পর খাদ্য হজমে এবং স্বাস্থ্য প্রতিরক্ষায় ব্যবহার করে। মায়ের দেহ থেকেই রং রস বর্ণ নিয়ে যেন একটা শিশুর বেড়ে ওঠা। পৃথিবীতে বেরিয়ে এসে যে হজম করতে হবে তার জন্য প্রয়োজনীয় ব্যাকটেরিয়াটুকুও মায়ের দেহেই তৈরি হয়। তারপর অন্তত ছ’মাস মায়ের দেহেই তার জন্য খাবার তৈরি হয়। এক এক ফোঁটা দুধ, এক এক ফোঁটা রক্ত। কিন্তু তবুও অধিকাংশ নারী জীবনের সবটুকু মায়া দিয়ে নিজের মধ্যে ধারণ করে তার পরবর্তী প্রজন্মকে। আনন্দই কী অস্থির হয়ে ওঠেনি একটা বাচ্চার জন্যে! বিয়ের এক বছর পর থেকেই রোহানকে কম বিরক্ত করেনি সে, ‘বয়েস হয়ে যাচ্ছে। ত্রিশ ছুঁই ছুঁই। আর দেরি করা ঠিক হবে না!’ রোহান চাইছিল একটা প্রমোশন হয়ে যাক, তারপর। রোহান খুব ভালবাসতে জানে। বউকে যখন তখন বুকে জড়িয়ে আদর করতে তার কোন দ্বিধা বা সংকোচ কাজ করে না। আনন্দও তাড়িয়ে তাড়িয়ে উপভোগ করে সেই সুখটুকু। এখন, এই ঘোরের মধ্যে আনন্দের মনে হয় রোহান তার পাশে। কপালে হাত। মাঝে মাঝে চুলে বিলি কেটে যাচ্ছে তার আঙুল। সে চোখ মেলে।

চোখ মেলে সে দেখে এটা অন্য একটা রুম। রক্ত দেওয়া হয়েছে তাকে। কিন্তু ব্যথাটা সে টের পায় না আর। ঘুম ঘুম ভাবটা রয়েছে। চোখ মেলতে কষ্ট হয়। সে সামান্য ঘাড়টা বাঁকা করে বুঝতে চেষ্টা করে অবস্থাটা। রোহান তাকে নড়তে দেখে অস্থির হয়ে যায়। কি করবে যেন বুঝতে পারে না। দৌড়ে গিয়ে নার্সকে ডেকে আনে। নার্স আসতে আসতে সে আবার ঘুমিয়ে পরে। এবার নার্স কপালে হাত রাখে। প্রেসারটা মাপে। রোহানকে বলেন, ‘এই বেলায় একটু রং চা দিব। তারপর ধীরে ধীরে স্যুপ, দুধের মত লিকুইড খাবার। ভালো আছে এখন। আপনি থাকুন পাশে। আমি বাচ্চাটা এনে দেখিয়ে নিয়ে যাই।’

পাদটিকা: পঁচিশ বছর পর, একটা ছিপছিপে গড়নের মেয়ে তার মায়ের কাঁচাপাকা চুলগুলোতে ঘসে ঘসে তেল দিতে দিতে বলে, ‘মা, তোমার মাথায় এখনও কত্তো চুল!’ আনন্দ চোখ বুজে সন্তানের স্নেহটুকু উপভোগ করতে করতে বলে, ‘আরও ঘন ছিল। যতবার কন্সিভ করেছি সব চুল গোছায় গোছায় উঠে গেছে। মা হতে গিয়ে মেয়েদের আরও কত কি ক্ষয়ে যায় জানিস? শরীর, মন, ক্যারিয়ার। এই ক্ষয় নিয়েই নারীরা যুদ্ধ করে প্রাকৃতিকভাবে সুবিধাজনক অবস্থানে থাকা পুরুষের সাথে।’ তার মিষ্টি মেয়েটা তাকে বিস্মিত করে দিয়ে বলে, ‘মা, এই যে নারীরাই পরবর্তী প্রজন্মকে নিজের দেহের মধ্যে বড় করে, সৃষ্টিকর্তার কাছ থেকে নারীর জন্য এটা যে কতো বড় ব্লেসিংস! ভাবতে পারো, তোমার মধ্যে আমি, ছোটন, অনু বেড়ে উঠেছি। আবার আমার বা অনুর মধ্যে বেড়ে উঠবে আরেকটা প্রাণ। এইভাবে হাজার হাজার বছর ধরে সমাজটাকে এগিয়ে নিচ্ছে নারী। তার নিজেকে একটু একটু করে ভেঙে মিশিয়ে দিচ্ছে সমাজের প্রতিটা প্রাণে… সে প্রাণ নারীই হোক, কি পুরুষ!’