ভালোবাসায়, শ্রদ্ধায় ড. আলী আসগর

0
514

রহমান মুস্তাফিজের মুক্তমত: বরেণ্য বিজ্ঞানী, খেলাঘর আন্দোলনের প্রাণপুরুষ, বুয়েটের সাবেক অধ্যাপক ডক্টর আলী আসগর বিদায় নিলেন। শিশুর সারল্যেভরা আলী আসগর স্যারকে প্রথমে দেখি সাদা-কালো যুগের বিটিভি’তে। তিনি তখন বিটিভি’তে বিজ্ঞান প্রজেক্ট বিষয়ক অনুষ্ঠান করতেন। সাপ্তাহিক ছুটির দিন, রোববার সকালে হতো সেই অনুষ্ঠান।

এরপর আমার স্কুল জীবনে অংশ নিলাম জাতীয় বিজ্ঞানমেলায়। সেই মেলায় কখনও বিচারক, কখনও আবার অতিথি হয়ে আসতেন তিনি। পরে জেনেছিলাম, খেলাঘর সংগঠনের মধ্যদিয়ে তিনি যে বিজ্ঞানমেলা শুরু করেছিলেন, তারই ধারাবাহিকতায় জাতীয় পর্যায়ে এই বিজ্ঞানমেলার প্রচলন শুরু হয়। ততোদিনে এই আয়োজনের সাথে যুক্ত হয় সরকার। এখনতো সপ্তাহজুড়ে জাতীয় বিজ্ঞানমেলা অনুষ্ঠিত হচ্ছে।

আলী আসগর স্যারের সাথে ঘনিষ্ঠতা, তার স্নেহ পাওয়া… এর সবই ১৯৯৬ সাল থেকে। ছাত্র আন্দোলন থেকে বিদায় নিয়ে যুক্ত হই খেলাঘর আন্দোলনে। ছাত্র আন্দোলন শেষে সাধারণত সবাই যুক্ত হন যুব বা শ্রমিক সংগঠনে অথবা সরাসরি রাজনৈতিক দলে। আমার মনে হলো, বয়স্ক একজন মানুষকে তার ভালো-মন্দ বোঝানোর কিছু নেই। ৩০, ৪০ বা ৫০ বছর বয়সের যে মানুষটি নিজের ভালো এতো বছরেও বুঝতে পারেননি, তাকে আমার মত তরুণ বোঝাবে কি করে! তারচেয়ে ভালো শিশুদের মাঝে কাজ করা। আর কিছু না হোক, তাদের মুক্তিযুদ্ধের কথা, প্রগতির কথা বলা যাবে। সেই বিবেচনায় সে সময়কার সাধারণ সম্পাদক আবদুল আজীজ ভাইয়ের সাথে কথা বলে যুক্ত হলাম খেলাঘরের সাথে।

শুরু থেকেই আলী আসগর স্যারকে বিভিন্ন সভা ও অনুষ্ঠানে দেখেছি। শিশুর সারল্যে ভরা মানুষটি যা বিশ্বাস করতেন, তা-ই বলতেন। অন্যকে তা-ই করতে বলতেন যা তিনি নিজে করতে পারতেন বা করতেন। কখনও কোন ধরণের শঠতা দেখিনি স্যারের মধ্যে। অন্য সব বুদ্ধিজীবীদের মত ভারিক্কী ভাব নিয়ে থাকেননি। ছোট-বড়ো সবাইকে শ্রদ্ধা ও সম্মান করতেন। সবার কাছ থেকেই ভালোটুকু বের করে আনতেন। বলতেন, বয়স, শ্রেণি বা সামাজিক অবস্থান নয়… যে কারও কাছ থেকেই শেখার মত কিছু না কিছু থাকে।

সময়কে গুরুত্ব দেয়ার অসাধারণ একটা গুণ ছিল স্যারের। যে কোন সভা বা অনুষ্ঠান শুরুর অন্তত ১০ মিনিট আগে হলেও তিনি পৌঁছে যেতেন। দেখা গেল স্যার পৌঁছে গেছেন, কিন্তু অধিকাংশ সদস্যের দেখা নেই। ১০টায় মিটিং। স্যার ঠিক ১০টার সময় বলতেন, মিটিং শুরু করো।

সভা সংশ্লিষ্ট সবাই যেহেতু তখনও পৌঁছাননি, তাই কেউ হয়তো বললেন, স্যার, সবাইতো এখনও আসেনি, আমরা কী আরেকটু অপেক্ষা করবো? এমন প্রশ্নে স্যার খুব অবাক হতেন। নির্ভেজাল বিস্ময় নিয়ে জানতে চাইতেন, যারা সময় মতো উপস্থিত হয়েছে তাদের কোন গুরুত্ব নেই? যে সময় মতো আসেনি সে-তো অপরাধ করেছে। তার জন্য অপেক্ষা করা মানেতো তাকেই পুরস্কৃত করা। মিটিং শুরু করো অথবা বাতিল করো। প্রয়োজনে আজ মিটিং হবে না। আমরা বরং অন্য বিষয় নিয়ে কথা বলি। সময়টা কাজে লাগাই।

ঢাকার বাইরে খেলাঘরের অনুষ্ঠান। স্যার প্রধান অতিথি। হয়তো বাসের টিকেট পাওয়া যায়নি। অথবা, পরিবহন ধর্মঘট। পাথরের বা বালির ট্রাকে স্যার উঠে পড়লেন অনুষ্ঠানে অংশ নিতে। এমনও হয়েছে, স্যার হয়তো বিদেশ যাওয়ার আগে কোন অনুষ্ঠানে যাবেন বলে কথা দিয়েছেন। অনুষ্ঠানের আগে স্যার দেশে নেই বলে সংশ্লিষ্ট জেলা বা শাখা সংগঠন চিন্তায় পরে অন্য অতিথি ঠিক করে নিয়েছে। কিন্তু নির্ধারিত দিনে স্যার ঠিকই অনুষ্ঠানে হাজির। যেহেতু তিনি কথা দিয়েছেন, তাই বিদেশ সফর সংক্ষিপ্ত করে অনুষ্ঠানের আগের দিন দেশে ফিরে এসেছেন। প্রতিশ্রুতি রক্ষা করাকে স্যার খুবই গুরুত্ব দিতেন।

দীর্ঘ ২১ বছর পর ১৯৯৬ সালে ক্ষমতায় এলো আওয়ামী লীগ। প্রধানমন্ত্রী হলেন জাতির জনকের কন্যা শেখ হাসিনা। শেখ হাসিনা সরকার অধ্যাপক কবীর চৌধুরীকে প্রধান করে গঠন করলো জাতীয় শিক্ষানীতি কমিশন। সেই কমিশনে সদস্য ছিলেন আলী আসগর স্যার। একমুখী বিজ্ঞানভিত্তিক শিক্ষানীতির প্রশ্নে সেই কমিশনে স্যার জোরালো ভূমিকা রাখলেন।

বিজ্ঞানভিত্তিক শিক্ষা ব্যবস্থার ওপর স্যারের এই গুরুত্ব দেয়াটা ভালোভাবে নিল না মৌলবাদী অপশক্তি। তারা স্যারকে ‘মুরতাদ’ আখ্যা দিল। স্যারের মাথার দাম নির্ধারণ করলো এক লাখ টাকা। সারাদেশে মৌলবাদী অপশক্তি মিছিল মিটিং আর ভাংচুর চালিয়ে ত্রাসের রাজত্ব কায়েম করার চেষ্টা করলো। স্যার নির্বিকার। রিকশা নিয়েই একাই যাতায়াত করেন। সাবধান হতে বললে বলতেন, আমাকে মেরে ফেলবে? পারলে মারুক। এতো সহজ? আমি ন্যায়ের পক্ষে আছি। আমাকে মারা অতো সহজ নয়।

মজা করে সে সময় স্যার বলতেন, তোমার মাথার দাম কতো? তুমি জানো? জানো না। আমিও জানতাম না আমার মাথার দাম কতো। এবার জানলাম… বলেই স্যার হো-হো করে হাসতেন।

কবীর চৌধুরী শিক্ষা কমিশনের শেষ দিন পর্যন্ত স্যার নিজের নীতিতে অটল ছিলেন। বলেছেন, সারাদেশের জন্য অভিন্ন বিজ্ঞানভিত্তিক শিক্ষা ব্যবস্থা কায়েম করা না গেলে প্রতিক্রিয়াশীল গোষ্ঠী দিনদিন শক্তিশালীই হবে। এই অপশক্তিকে রুখতে হবে। এই জন্যই খেলাঘর আন্দোলনকে আরও শক্তিশালী করতে হবে।

নিজের পছন্দের বিষয় পদার্থবিদ্যা নিয়ে ডক্টর আলী আসগর লিখবেন এটাই স্বাভাবিক। এর বাইরেও তিনি বিজ্ঞানের নানা বিষয়ে লিখেছেন। লিখেছেন শিশুতোষ লেখাও। পরিবেশ, গার্হস্থ্য জীবন থেকে শুরু করে নানা বিষয়ে লিখেছেন। ডক্টর আলী আসগরের সব লেখাতেই কিছু অপ্রচলিত শব্দ থাকতো। স্যার বলতেন, বাংলা ভাষা অনেক সমৃদ্ধ। এর কিছু শব্দ কালের বিবর্তনে হারিয়ে যাবে এটাই স্বাভাবিক। কিন্তু আমরা চাইলে এই শব্দগুলোকে বাঁচিয়ে রাখতে পারি। সবাই যদি নিজের লেখায় এমন অপ্রচলিত শব্দ কম-বেশি ব্যবহার করি তাহলেই শব্দগুলো বেঁচে থাকবে। নয়তো ব্যবহারের অভাবে এগুলো এক সময় হারিয়ে যাবে।

১৯৯৬ সালে ছাত্র আন্দোলন থেকে বিদায় নিয়ে খেলাঘরের সাথে যুক্ত হলাম। পরের জাতীয় সম্মেলন ১৯৯৯ সালে। সেই সম্মেলনে আমি কেন্দ্রীয় কমিটির সম্পাদক হলাম। সেটাও একটা ইতিহাস। আমার নাম ছিল সদস্য হিসেবে। কিন্তু সম্পাদকমণ্ডলীর সদস্য মনোয়ারা সুরুজ মনু আপা তরুণ সংগঠক হিসেবে আমাকে সম্পাদকমণ্ডলীতে অন্তর্ভূক্ত করতে নিজে সরে গেলেন। মনু আপার শুন্যস্থানে আমি সম্পাদকমণ্ডলীতে স্থান পেলাম। আলী আসগর স্যার ও সে সময়কার সাধারণ সম্পাদক আবদুল আজীজ ভাই মনু আপার এ সিদ্ধান্তে খুশি হয়েছিলেন। তরুণদের জায়গা করে দিতে পুরনোদের সরে যাওয়ার নজীর বাংলাদেশে নেই। মনু আপা খেলাঘরে সেই ইতিহাস গড়েছিলেন। মনু আপার এই সিদ্ধান্তে আমিও আলী আসগর স্যারকে আরও কাছ থেকে দেখার সুযোগ পেলাম।

সেবারের সম্মেলনে প্রধান অতিথি হয়ে এসেছিলেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের পর শেখ হাসিনা দ্বিতীয় সরকার প্রধান, যিনি খেলাঘরের জাতীয় সম্মেলনে যোগ দেন। বরাবরই খেলাঘর ক্ষমতার ভরকেন্দ্র থেকে দূরে ছিল। খেলাঘরের দৃষ্টিভঙ্গী অনুযায়ী শিশুদের বিষয়ে রাষ্ট্রের কিছু মৌলিক সিদ্ধান্ত নেয়ার ছিল। দেশে ক্রমশ বেড়ে যাওয়া মৌলবাদী অপতৎপরতার বিরুদ্ধে কর্মীদের সোচ্চার করতে এবং সাংগঠনিক বিষয়ে কিছু প্রতিবন্ধকতা দূর করতেও প্রধানমন্ত্রীর উপস্থিতি জরুরী ছিল। সে বিষয়ে সরাসরি আলোচনার জন্যই শেখ হাসিনাকে সম্মেলনে আমন্ত্রণ জানানো হয়েছিল।

উদ্বোধন অনুষ্ঠানের সভা প্রধান ডক্টর আলী আসগর সেদিন শিশুর জন্য কল্যাণকর রাষ্ট্র বিষয়ে অসাধারণ বক্তৃতা দিয়েছিলেন। সেই বক্তৃতায় উজ্জীবিত হয়েছিলেন প্রধানমন্ত্রী। উদ্বোধন পর্ব শেষে শিশুদের বর্ণিল শোভাযাত্রা বের হওয়ার কথা ছিল প্রধানমন্ত্রী বিদায় নেয়ার পর। কিন্তু শেখ হাসিনা শোভাযাত্রার আয়োজন দেখে নিজেও যেন শিশু হয়ে গেলেন। তিনি জানালেন, শোভাযাত্রায় অংশ নিবেন। নিরাপত্তা কর্মকর্তাদের নিষেধ শুনতে তিনি রাজী নয়। আলী আসগর স্যারও শিশুর সারল্যে বলে ফেললেন, শিশুরা সন্ত্রাসী না। তাদের সাথে মিছিলে গেলে নিরাপত্তা বিঘ্নিত হবে না।

এমনতেই নাচনি বুড়ি, তার ওপরে ঢোলের বাড়ি। সংগঠনের নেতা-কর্মী-সংগঠকরা যখন জানলো প্রধানমন্ত্রী শোভাযাত্রায় থাকবেন, তখন আর সাধ্য কার তাদের উচ্ছ্বাস থামায়। শিশু একাডেমি থেকে শিক্ষা ভবন পর্যন্ত প্রধানমন্ত্রী শোভাযাত্রায় শিশুদের সাথে হাঁটলেন। ডক্টর আলী আসগর স্যার ও আজীজ ভাইয়ের সাথে শিশুদের নিয়ে নিজেন স্বপ্নের কথা বলতে বলতে প্রধানমন্ত্রী অংশ নিলেন সেই শোভাযাত্রায়।

ডক্টর আলী আসগর রাষ্ট্রের শীর্ষ ব্যক্তি থেকে শুরু করে একজন শিশুর সাথেও মিশতে পারতেন সমান তালে। বিশ্বাস করতেন নেতৃত্বের বিকাশে। তিনি সংগঠনের সভাপতিমণ্ডলীর চেয়ারম্যান পদ থেকে বিদায় নিয়ে নতুন কাউকে চেয়ারম্যান করার জন্য বারবার তাগাদা দিতেন। কিন্তু সারাদেশের নেতা-কর্মীরা সে আহ্বানে কখনও সাড়া দেয়ার প্রয়োজন মনে করেনি। মনে করলে ২০০৫ সালে স্যারকে হয়তো অপমানিত হয়ে চোখের পানি ফেলতে হতো না।

একটি বিশেষ পরিস্থিতির তৈরি হলো ২০০৫ সালে। তৈরি করা হলো নানা সংকটের। কেন্দ্রীয় কমিটির শেষ সভায় মাত্র ২/৩ জন স্যারের চেয়ারম্যান হওয়া প্রশ্নে আপত্তি উত্থাপন করলেন। স্যার বিদায় নিতে মানসিকভাবে বেশ কয়েক বছর ধরেই তৈরি ছিলেন। তাই রাজি হয়ে গেলেন। কিন্তু সভায় থাকা আমরা বাকি ৩০/৩২ জন স্যারকে ছাড়তে রাজি নই। সে সভায় কিছু অনাকাঙ্খিত ও শৃঙ্খলা ভঙের ঘটনা ঘটলো। স্যার ভোর সাড়ে ৪টার দিকে চোখের পানি ফেলতে ফেলতে সম্মেলনস্থল ত্যাগ করতে চাইলেন। আমরা স্যারকে আবার শিশু একাডেমির দোতলায় নিয়ে এলাম।

সভায় শেষ পর্যন্ত আমাকে কেন্দ্রীয় কমিটির সাধারণ সম্পপাদক করার সিদ্ধান্ত হলো। আমি বললাম, রাজি আছি, তবে শর্ত আছে।

সবাই শর্ত জানতে চাইলেন। বললাম, স্যার যদি চেয়ারম্যান থাকেন তবেই আমি সাধারণ সম্পাদকের দায়িত্ব নিব।

একদিকে সংগঠনের প্রতি ভালোবাসা, আরেকদিকে আমাকে স্নেহ করেন… দুইয়ে মিলে স্যার রাজি হলেন। পরে বিষয় নির্বাচনী কমিটিও সর্বসম্মতভাবে সিদ্ধান্ত নেয় ডক্টর আলী আসগর ও রহমান মুস্তাফিজ পরবর্তী তিন বছরের জন্য খেলাঘর সংগঠনকে নেতৃত্ব দিবেন।

টানা ১৪ ঘন্টা এই সিদ্ধান্তই কার্যকর ছিল। সাংগঠনিক অধিবেশনের নির্বাচনী অধিবেশনে আরেক নাটকের অবতারণা হলো। বাম ঘরানার একটি রাজনৈতিক দলের সাথে সংশ্লিষ্টরা সেই নাটকের কুশীলব। সংগঠনের ভাঙন ঠেকাতে আমি সাধারণ সম্পাদকের পদ থেকে সরে দাঁড়ালাম। নাম প্রত্যাহার করতে গিয়ে প্রায় ৩০ মিনিটের একটা বক্তব্য রাখলাম সংগঠনের ঐক্য ও সংহতি বজায় রাখার আহ্বান জানিয়ে। নতুন কমিটি হলো। ডক্টর আলী আসগর ও ডাক্তার লেনিন চৌধুরী চেয়ারম্যান ও সাধারণ সম্পাদক হিসেবে দায়িত্ব নিলেন। আমি সম্পাদক হিসেবে থাকলাম।

কমিটি গঠনের পর স্যার আমাকে বুকে জড়িয়ে ধরলেন। বললেন, সারাদেশের সংগঠনের কর্মীদের জন্য এটি অমূল্য শিক্ষা।

বিজ্ঞানমনষ্ক জাতি গঠনে তার নিরলস চেষ্টা ছিল অবিস্মরণীয়। ডক্টর আবদুল্লাহ আল মুতী শরফুদ্দীন ও ডক্টর আলী আসগর বিজ্ঞানমনষ্ক জাতি গঠনের উদ্দেশে স্বাধীনতার পর বাংলাদেশ টেলিভিশনে শুরু করেন বিজ্ঞান বিষয়ক অনুষ্ঠান। আমাদের শৈশব-কৈশোরে এটি অসম্ভব জনপ্রিয় একটি অনুষ্ঠান ছিল। দেশজুড়ে বিজ্ঞানমেলার আয়োজন, বিটিভি-তে বিজ্ঞান বিষয়ক অনুষ্ঠান উপস্থাপনা আর সহজ সরল ভাষায় বিজ্ঞানকে সাধারণের কাছে পৌঁছে দিতে তিনি কাজ করেছেন প্রায় ষাট দশক।

১৯৮৬ সালে ডক্টর আলী আসগর জাতীয় শিশু-কিশোর সংগঠন খেলাঘরের সভাপতিমণ্ডলীর চেয়ারম্যান নির্বাচিত হন। ২০০৯ সালের জাতীয় সম্মেলন পর্যন্ত তিনি খেলাঘরের চেয়ারম্যান হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। ২০০৯ সাল থেকে আমৃত্যু তিনি খেলাঘরের প্রধান উপদেষ্টা ছিলেন।

ডক্টর আলী আসগর বিজ্ঞান, প্রকৃতি, সমাজ ও শিশুতোষ বিষয়ক অসংখ্য বই লিখেছেন। নিয়মিত কলাম লিখতেন মুক্তিযুদ্ধের পক্ষের প্রগতিশীল দৈনিক পত্রিকায়। আমার সৌভাগ্য হয়েছিল স্যারের দুই/তিনটি বইয়ের প্রুফ দেখার।

পদার্থ বিজ্ঞানের যুগান্তকারী আবিষ্কার চুম্বকের দুই মেরুর মধ্যবর্তী স্থান নিরপেক্ষ। নোবেলজয়ী পদার্থবিদ প্রফেসর সালামের তত্ত্বাবধানের পিএইচডি গবেষণা করতে গিয়ে এটি আবিষ্কার করেন সদ্যস্বাধীন বাংলাদেশের স্বপ্নবান তরুণ ডক্টর আলী আসগর। তার এই আবিষ্কারে খুশী হয়ে প্রয়েসর সালাম তাকে একটি গোলাকার চুম্বক উপহার দেন। বিরল আকৃতির এই চুম্বকটি তখনকার বাজারেই কয়েক কোটি টাকা মূল্যমানের। দেশে ফিরে আলী আসগর স্যার এই চুম্বকটি বুয়েটের পদার্থবিদ্যা বিভাগে উপহার হিসেবে দিয়ে দিলেন। তার ভাষায়, “এই দামি জিনিষ বাসায় থাকলে চোর-ডাকাতের ভয় আছে। আবার সব সময় এটি চোখের সামনে থাকলে লোভী হয়ে উঠতে পারি। এটি বরং বিশ্ববিদ্যালয়ে থাকলে শিক্ষার্থী আর শিক্ষকদের গবেষণার সুযোগ থাকবে। আবিষ্কার হতে পারে নানা বিষয়ে।”

অবসরে যাওয়ার পরও প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ স্যারকে ছাড়তে রাজি হলেন না। তারা স্যারকে বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ে রশীদ চেয়ারের সভাপতি করলেন।

আলী আসগর স্যার আজ নেই। ১৯৩৮ সালে সিরাজগঞ্জের শাহজাদপুরে যেই জীবনের শুরু, ২০২০ সালের ১৬ জুলাই বৃহস্পতিবার থেমে গেছে বর্ণিল সেই জীবন। উত্তরার ৪ নম্বর সেক্টর জামে মসজিদে জানাজা শেষে পাশের কবরস্থানে শায়িত হলেন চিরনিদ্রায়।