মুক্তমত: নারীর যৌনতা

0
1734

এবারের নারী দিবসে গণমাধ্যমে নানা আয়োজন ছিল প্রতিবছরের মতই। যদিও ‘মুজিব জন্মশতবর্ষ’ ও ‘করোনা ভাইরাস’ আলোচনার কেন্দ্রে থাকায় নারী দিবসে অন্যবারের মত মিডিয়ায় ঝড় তুলতে পারেনি। তবে নারী দিবস নিয়ে লেখা, শুভেচ্ছা কার্ড আর ছবি পোস্ট দিয়েছেন  সোস্যাল মিডিয়া ব্যবহারকারীরা। অনেক শুভ কামনার ভিড়ে নারীর যৌনজীবন নয়ে একটি নাতিদীর্ঘ লেখা নজর কেড়েছে অনেকেরই। লেখার বিষয় বা উপস্থাপনার বৈচিত্র নিয়ে কারও কারও আপত্তি থাকতে পারে, কিন্তু এতে বেশ কিছু সামাজিক অসঙ্গতি তুলে ধরা হয়েছে। তাই লেখাটি পাঠকের জন্য স্থান পেল আর্ট নিউজের মতামত কলামে। ইফতিয়ার সুমনের লেখাটি নেয়া হয়েছে জেবুননাহার ইসলামের ফেসবুক টাইম লাইন থেকে।

আমাদের সমাজে সবচেয়ে বড় ট্যাবু “নারীর যৌনতা”। একই সাথে অর্থের বিনিময়ে যৌনতা, সমাজে যার পরিচিতি বেশ্যাবৃত্তি বা পতিতাবৃত্তি নামে।

আমাদের বাংলাদেশে কিংবা বাংলাদেশের মত সব পিতৃতান্ত্রিক দেশেই নারীরা সমাজে দ্বিতীয় শ্রেণির নাগরিক হিসেবে বেঁচে থাকেন। এই বঞ্চিত নারীদের মধ্যে আবার সবচেয়ে বেশি বঞ্চনার শিকার হন সেই নারীরা যারা সাধারণত বাধ্য হয়ে, অত্যাচারিত হয়ে, প্রতারিত হয়ে যৌনকর্মী হিসেবে কাজ করেন। (ইচ্ছাকৃতভাবে স্বপ্রণোদিত ভাবে এই পেশায় কেউ আসেন কিনা আমার জানা নাই)। আমাদের সমাজ এই নারীদের দেখে ঘৃণার চোখে। “Havocscope” নামক এক ওয়েবসাইটের ২০১৪ সালের মার্চ মাসের এক তারিখে ছাপা হওয়া এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে বাংলাদেশে আনুমানিক যৌনকর্মীর সংখ্যা ২ লাখ।

ধরে নিলাম সংখ্যাটা এখনও দুই লাখ। এই দুই লাখ মানুষ আমাদের সমাজের, আমাদের সমাজের পুরুষদের প্রয়োজনে, পুরুষদের ইচ্ছায়, পুরুষদের কারণে এই পেশায় নিয়োজিত হচ্ছে বা হতে বাধ্য হচ্ছে। সেটার জন্য আমরা বা আমাদের সমাজ কোন ধরনের গ্লানিবোধ করি না। বরং আমাদের দ্বারা বাধ্য হয়ে এই পথে আসা নারীদেরকে অপমান, অপদস্থ এবং নির্যাতন করে ন্যূনতম নাগরিক অধিকার থেকে বঞ্চিত করতে আমাদের কোন সমস্যা হয় না।

আসলে আমরা সবাই ভাবতে পছন্দ করি যে, আমরা নিজেরা নারীদের নিরাপত্তা, অধিকার নিয়ে খুবই সচেতন এবং আমরা কেয়ার করি; আমরা সোশ্যাল মিডিয়ায় নারী অধিকার নিয়ে ক্যাম্পেইন করি। কোন নারী নির্যাতন, ধর্ষণের খবর শুনলে আমরা মানববন্ধন করি, মিছিল করি অপরাধীদের বিচার চেয়ে।

কিন্তু সকল নারীর ক্ষেত্রে আমাদের রিয়েকশন কিন্তু এক হয় না। আমাদের এক শ্রেণির নারীর নিরাপত্তা বা সম্মান নিয়ে কথা বলতে আমরা স্বচ্ছন্দবোধ করি না। তাদের মান সম্মান, অধিকার নিয়ে কথা বলতে গেলে আমাদের বিবেক বোবা হয়ে যায়।

জ্বী, আমি যৌনকর্মীদের কথাই বলছি। অধিকাংশ মানুষই যদি কোন নারীকে অপমান করতে চায় তবে তাকে “বেশ্যা” বলে গালি দেয়। অথচ যৌনকর্মীরাও আর দশটা পেশাজীবী মানুষের মত এই সমাজের, এই রাষ্ট্রের সম্মানিত নাগরিক হওয়ার অধিকার রাখেন। আমি অবাক হয়ে ভাবি, এই দেশে মাদক ব্যবসায়ী, চাঁদাবাজ, ঘুষখোর, এমনকি খুনি শব্দটাও লজ্জাজনক নয়, কিন্তু বেশ্যা শব্দটা লজ্জার। হিসেব করলে দেখবেন মাদক ব্যবসায়ী, চাঁদাবাজ, ঘুষখোর, খুনি এরা রাষ্ট্র, সমাজ, দুনিয়া সবার জন্যই ক্ষতিকর। যৌনকর্মীরা কিন্তু না তা। তবুও গ্লানি নিয়ে বাঁচতে হয় যৌনকর্মীদের। আসলে যুক্তি আর আমাদের নৈতিকতার ক্রাইটেরিয়া অনেক ক্ষেত্রেই একে অপরের সাথে মিল খায় না।

আমাদের দেশে আইনের বৃত্তে থেকে নিয়মতান্ত্রিকভাবে অর্থের বিনিময়ে যৌনকর্মে লিপ্ত হওয়া অপরাধ নয়। অপরাধ হচ্ছে কাউকে এই পেশায় আসতে বাধ্য করা। কারো দুর্বলতার সুযোগ নিয়ে, প্রতারিত করে, তার ইচ্ছার বিরুদ্ধে এই পেশায় আনা। অতএব কেউ যদি স্বেচ্ছায় নিজের শরীরকে ব্যবহার করে জীবিকা নির্বাহ করতে চায় বা অর্থনৈতিকভাবে লাভবান হতে চায় তাহলে সেটা অপরাধ নয়। বরং উক্ত ব্যক্তি সব ধরনের মানবিক অধিকার এবং সম্মানের সাথেই এই পেশায় কাজ করার অধিকার রাখেন। কিন্তু সামাজিকভাবে আমরা সেটা কখনোই মেনে নিতে পারিনা।

এই তো গেলো যৌনকর্মীদের যথাযথ সম্মান দেওয়ার কথা, এখন বলি নিরাপত্তার কথা। যেহেতু আমাদের দেশে একজন যৌনকর্মীর উপর সামাজিক, নৈতিক, এবং কিছু কিছু ক্ষেত্রে রাষ্ট্রীয়ভাবেই বিভিন্ন হুমকি লটকানো থাকে, তাই এই মানুষগুলো থাকে খুবই ভঙ্গুর অবস্থায়। অর্থের বিনিময়ে যৌনকর্মে জড়ানোর মানে এই নয় যে একজন যৌনকর্মী যার তার সাথে, যেকোনভাবেই যৌনকর্মে লিপ্ত হতে বাধ্য। এখানে তার ইচ্ছা এবং সম্মতি আবশ্যক হলেও আমাদের দেশের যৌনকর্মীরা সেই সুবিধা বা সুযোগ কখনোই পান না। তারা প্রায় সব ক্ষেত্রেই তাদের দালাল, সর্দারনী এবং কাস্টমার দ্বারা নিজেদের ইচ্ছা এবং সম্মতির বিরুদ্ধে যৌনকর্মে জড়াতে বাধ্য হন, কিংবা বলতে পারি ধর্ষিত হন, নির্যাতিত হন।

একজন মানুষের মৌলিক অধিকারগুলোর একটা হচ্ছে স্বাস্থ্য। কিন্তু আমাদের দেশের অধিকাংশ যৌনকর্মী অস্বাস্থ্যকর পরিবেশে, অনিরাপদ যৌনতায় জড়াতে বাধ্য হন। কিন্তু এসব নিয়ে আমাদের সমাজের মেইন স্ট্রিমে কোন ধরনের আলাপ আলোচনা শুনবেন না এনজিও লেভেল বাদে। যেটা আমাদের অমানবিক আচরণেরই পরিচায়ক। আমাদের দেশের প্রত্যেক যৌনকর্মী যথাযথ সম্মান, স্বাধীনতা, নিরাপত্তা এবং পারিশ্রমিক ডিজার্ভ করেন। সমাজ হিসেবে আমাদের উচিৎ তা নিশ্চিত করতে রাষ্ট্র ব্যবস্থাকে বাধ্য করা।

যৌনতায় নারীর অবস্থানটা কি আমাদের সমাজে?

নারীকে পুরুষের যৌন আকাঙ্ক্ষা চরিতার্থ করার একটি উপাদান ছাড়া আর কিছু কি ভাবা হয়? এই দেশের সিংহভাগ নারীই শুধুমাত্র ভোগ্যপণ্য হিসেবে বিবেচিত হন আমাদের পুরুষদের কাছে। নারীর আকাঙ্ক্ষা, নারীর ইচ্ছা, নারীর সুবিধা নিয়ে ভাবার মত পুরুষ কতজন আছেন? কয়জন পুরুষ শারীরিক সম্পর্কের সময় নারীর সম্মতি, ইচ্ছার তোয়াক্কা করেন? নারীকে সাবমিসিভ এলিমেন্ট না ভেবে সমান অংশিদার ভাবেন? কয়জন পুরুষ শুধু নিজের স্যাটিস্ফ্যাকশনের কথা না ভেবে নিজের নারী সঙ্গীর স্যাটিস্ফ্যাকশনের কথা ভাবেন? এমন পুরুষের সংখ্যা এদেশে শতকরা হারে কত তা যাচাইয়ের দায়িত্ব নাহয় এই লেখার পাঠকের বিবেচনার উপরই ছেড়ে দিলাম।

এবার আসি নারীর যৌনতার প্রসঙ্গে।

বাংলাদেশে একজন নারী তার যৌনজীবন নিয়ে কথা বলতে গেলে সর্বপ্রথম যেই শব্দগুলো শুনবেন সেটা হচ্ছে চরিত্রহীনা, বেশ্যা। ভাবটা এমন যে নারীদের কোন প্রকার যৌন কামনা থাকতে নেই কিংবা যৌনতা পুরুষের একার বস্তু।

এদেশে একজন পুরুষ তার যৌনকামনা পূরণ করতে যৌনকর্মীদের কাছে খুব সহজেই যেতে পারেন। অথচ এই সমাজ এতই নারীবিরোধী যে, একজন প্রাপ্তবয়স্ক নারী নিজের যৌনতার চাহিদা পূরণ করার সব ধরনের সুযোগ থেকে বঞ্চিত। এই দেশে পুরুষদের যৌন চাহিদা পূরণের জন্য তাদের স্ত্রী, প্রেমিকা ছাড়াও দুই লাখের বেশি যৌনকর্মী থাকলেও (কেউ যদি বলতে চান শুধু অবিবাহিত, সিংগেল পুরুষরাই যৌনকর্মীদের কাছে যায়, তাহলে তার সাথে এই ব্যাপারে বিস্তারিত আলাপে যেতে আমার কোনই আপত্তি নাই। কিন্তু সেটা এই লেখায় উপযুক্ত ভাবছি না।) এই দেশের একজন নারীও তার যৌনতার চাহিদা পূরণে সামাজিক ভাবে মুক্ত নন। তারা সম্পূর্ণভাবে নির্ভরশীল থাকেন বর কিংবা প্রেমিকের উপর। এটা না হয় গেলো বিবাহিতা কিংবা সম্পর্কে থাকা নারীদের কথা, কিন্তু যারা অবিবাহিতা? যারা ডিভোর্সী? তাদের যৌনতার চাহিদাকে অস্বীকার করার অধিকার এই সমাজ বা রাষ্ট্রের কি আদৌ আছে? নাই।

এইটা একটা ওপেন সিক্রেট যে আমাদের দেশের পুরুষদের একটা বড় অংশই নানান কারণে যৌনসক্ষমতার অভাবে ভুগছেন। যার প্রমাণ হিসেবে দেখা যায় বিভিন্ন ভুয়া হার্বাল চিকিৎসালয় কিংবা রাস্তাঘাটের ভুয়া ক্যানভাসারদের বিপুল গ্রাহক সংখ্যা। তো এসব অক্ষম পুরুষদের স্ত্রী বা প্রেমিকারাও বাধ্য হয়েই আজীবন পার করে দেন অসুস্থ, অতৃপ্ত যৌনজীবন নিয়েই। অনেক পুরুষই আছেন যারা নিজেদের অক্ষমতা ঢাকতে স্ত্রীকে নির্যাতন করলেও নিজের পুরুষত্বে প্রশ্ন ওঠার ভয়ে নিজের অক্ষমতা থেকে মুক্তি পেতে চিকিৎসা করান না। যেটা কোন বিচারেই কোন মানবিক সমাজের পরিচয় হতে পারে না।

যদি আমাদের দেশের বা সমাজের পুরুষরা নিজেদের অহম এবং মিথ্যা পৌরুষের গরিমা ত্যাগ করে সত্য স্বীকার করতে পারেন এবং লোকলজ্জার ভয় ভেঙে এদেশের নারীরা নিজেদের অতৃপ্ত যৌন চাহিদার কথা বলতে পারেন তাহলে এই ব্যাপারটা পরিষ্কার হয়ে যাবে যে, আমাদের দেশে পুরুষ যৌনকর্মীদের প্রয়োজনীয়তা কতটা রয়েছে। আমি ব্যক্তিগতভাবে এমন অনেককেই দেখেছি যারা অস্বাস্থ্যকর যৌনজীবন নিয়েই জীবন কাটিয়ে দিচ্ছেন সমাজ, সংসার আর সমাজ কর্তৃক চাপিয়ে দেওয়া মিথ্যা নৈতিকতার বেড়াজালে আটকে থাকার কারণে। সেটা আমাদের মোট জনসংখ্যার অর্ধেক, নারীদের শতকরা দশ শতাংশ হলেও প্রায় আশি লাখ নারীর গল্প। আমি হলফ করে বলতে পারি এই পরিসংখ্যানটা দশ শতাংশের আরো বেশি। কিন্তু জাতি হিসেবে এই ইস্যুতে আমরা অন্ধ বোবা কালা হয়ে বসে আছি। আমাদের সমাজের এত বড় একটা অংশ বঞ্চিত হচ্ছে কিন্তু তবুও এদেশের পুরুষরা নিজেদের অহম বাঁচাতে এভাবেই বঞ্চিত করে যাবেন এদেশের নারীদের।

তাই এইবার এই নারী দিবসের চাওয়া, নারী যৌনকর্মীদের যথাযথ সম্মান দেওয়া হোক এবং এদেশের নারীদের যৌনতার স্বাধীনতা দেওয়া হোক।