মে দিবসের ইতিকথা: কাজী তামান্না তৃষা

0
721
কাজী তামান্না তৃষা

কাজী তামান্না তৃষার মুক্তমত: ঊনবিংশ শতাব্দীতে শ্রমিকরা দিনে গড়ে ১২ ঘণ্টা কাজ করতেন। বিনিময়ে মজুরি পেতেন সামান্যই। শিল্প মালিকরা শ্রমিকদের শ্রম শোষণ করে অতিরিক্ত মুনাফা ভোগ করতেন। মালিকের বিলাসী জীবনের বিপরীতে শ্রমিকরা মানবেতর জীবনযাপন করতেন।

আর্থিকভাবে শ্রমিকদের মানবেতর জীবন যাপন ছিল মুদ্রার একপিঠে। অন্যদিকে ছিল মালিকপক্ষের শারীরিক নির্যাতন। শ্রমিকদের গণ্য করা হতো ক্রীতদাস হিসেবে। কথায় কথায় কঠোর শারীরিক শাস্তি ছিল স্বাভাবিক ঘটনা।

১৮৬০ সালে শ্রমিকরা তাদের মজুরি না কমিয়ে সারা দিনে আট ঘণ্টা কাজের সময় নির্ধারণের জন্য দাবি জানান। এ জন্য তারা “আমেরিকান ফেডারেশন অব লেবার” নামে একটি সংগঠনও গড়ে তোলেন। এই সংগঠন শ্রমিকদের প্রাপ্য মজুরি ও অধিকার আদায়ের লক্ষ্যে আন্দোলন শুরু করে। তাদের স্লোগান ছিল-

“Eight hours for work, eight hours for rest, eight hours for what we will.”

হে-মার্কেট ট্রাজেডি

১৮৮৪ সালে যুক্তরাষ্ট্রের শিকাগো শহরের একদল শ্রমিক দৈনিক ৮ ঘণ্টা কাজ করার দাবিতে আন্দোলন শুরু করেন। তারা এ দাবী কার্যকর করার জন্য সময় বেঁধে দেন ১৮৮৬ সালের পয়লা মে পর্যন্ত। মালিকপক্ষ এ দাবি মানতে নারাজ। এ সময় একটি পত্রিকায় শ্রমিকদের জীবনের সুখ-দুঃখ নিয়ে একটি প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়। আলোড়ন তোলে সে প্রতিবেদন। এই প্রতিবেদন প্রকাশের পর শ্রমিক বিদ্রোহ ওঠে চরমে। শিকাগো শহর হয়ে ওঠে প্রতিবাদ-বিদ্রোহের মূল মঞ্চ।

পয়লা মে যতই এগিয়ে আসছিল, দুই পক্ষের সংঘর্ষ অনিবার্য হয়ে উঠছিল। মালিক পক্ষ শ্রমিকের ৮ ঘন্টার দাবি আবারও প্রত্যাখ্যান করে। পুলিশ আগেই শ্রমিকদের উপর নির্মম নির্যাতন চালিয়েছিল। আবারও চললো নীপিড়নের প্রস্তুতি। শ্রমিকদের ওপর গুলি চালাতে পুলিশকে বিশেষ অস্ত্র কিনে দেন ব্যবসায়ীরা। পয়লা মে যুক্তরাষ্ট্রের প্রায় তিন লাখ শ্রমিক কাজ ফেলে নেমে আসেন রাজপথে। ২০২০ সালেও ৩ লাখ শ্রমিকের আন্দোলনে যুক্ত হওয়া অনেক বড় ঘটনা। সেখানে আজ থেকে ১৩৪ বছর আগে, ১৮৮৬ সালে ৩ লাখ লোকের সম্পৃক্ততায় গড়ে ওঠা আন্দোলন অনেক বড় ব্যাপার ছিল।

৪ মে, ১৮৮৬ সাল। ঘড়িতে তখন সন্ধ্যা সাড়ে সাতটা। চারিদিকে হালকা বৃষ্টির সাথে হিমেল হাওয়া বইছে। এরই মধ্যে শিকাগোর হে-মার্কেট স্কয়ার নামক এক বাণিজ্যিক এলাকায় শ্রমিকরা মিছিলের উদ্দেশে জড়ো হন। তারা ১৮৭২ সালে কানাডায় অনুষ্ঠিত এক বিশাল শ্রমিক শোভাযাত্রার সাফল্যে উদ্বুদ্ধ হয়ে এটি করেছিলেন।

অগাস্ট স্পীজ নামে এক নেতা জড়ো হওয়া শ্রমিকদের উদ্দেশে বক্তব্য রাখছিলেন। সে সময় দূরে দাঁড়ানো পুলিশ দলের কাছে একটি বোমার বিস্ফোরণ ঘটে। এতে মেথিয়াস জে ডিগান নামের একজন পুলিশ ঘটনাস্থলেই মারা যান। পরে আহত আরও ৬ জন মারা যান। বোমা বিস্ফোরণের পর পুলিশবাহিনী শ্রমিকদের উপর অতর্কিতে হামলা শুরু করে। পুলিশের এই হামলা রূপ নেয় পুলিশ-শ্রমিক দাঙ্গায়। এই দাঙ্গায় ১১ জন শ্রমিক শহীদ হন।

মিথ্যা অভিযোগে ফাঁসি

১৮৮৪ সালে গড়ে ওঠা আন্দোলনের পোস্টার

পুলিশের পক্ষ থেকে শ্রমিকদের হত্যা মামলায় অভিযুক্ত করে অগাস্ট স্পীজ সহ মোট আটজনকে প্রহসনমূলকভাবে দোষী সাব্যস্ত করা হয়। তাদের মধ্যে ‘অস্কার নীবে’-কে ১৫ বছরের কারাদণ্ড দেয়া হয়। ফাঁসি দেয়ার আগেই কারারুদ্ধ অবস্থায় ‘লুইস লিং’ নামের একজন শ্রমিক আত্মহত্যা করেন। বাকি ছয়জনকে ১৮৮৭ সালের ১১ নভেম্বর উন্মুক্ত স্থানে ফাঁসি দেয়া হয়।

ফাঁসিতে ঝোলার পূর্ব মুহূর্তে অগাস্ট স্পীজ বলেছিলেন, “The day will come when our silence will be more powerful than the voices you are throttling today.”

তখন অ্যাডল্ফ ফিশার বলেছিলেন, “This is the happiest moment of my life.”

এবং আরেক শ্রমিক আলবার্ট পারসন্স বলেছিলেন, “Let the voices of people be heard…”. তিনি এই বাক্যটি শেষ করতে পারেননি। তার আগেই ফাঁসিতে মৃত্যু হয় তার।

প্রহসনের বিচারে শ্রমিকদের মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করার পর পুরো ষড়যন্ত্র প্রকাশ পায়। ফাঁসি কার্যকরের ৬ বছর পর, ১৮৯৩ সালের ২৬ জুন ইলিনয়ের গভর্নর জন পিটার অল্টগেল্ড -এর পক্ষ থেকে জানানো হয়, মিথ্যে ছিল ওই বিচার। পুলিশের কমান্ডারকে দুর্নীতির দায়ে অভিযুক্ত করা হয়।

শেষ পর্যন্ত শ্রমিকদের ‘দৈনিক আট ঘণ্টা কাজ’-এর দাবি আনুষ্ঠানিকভাবে স্বীকৃতি পায়। সেই থেকে পয়লা মে পালিত হয় শ্রমিকদের আত্মদান আর দাবি আদায়ের দিন হিসেবে।

হে-মার্কেট স্মৃতিস্তম্ভ

শিকাগোর ফরেস্ট পার্কে জার্মান ওয়াল্ডহেইম কবরস্থানে (বর্তমানে যা ‘ফরেস্ট হোম কবরস্থান’) ফাঁসি দেয়া পাঁচ শহীদ শ্রমিকদের (ফিল্ডেন ব্যতীত) সমাহিত করা হয়। ১৮৯৩ সালে তাদের স্মরণে একটি স্মৃতিস্তম্ভ নির্মিত হয়। এর একশ’ বছর পর এসে ভাস্কর আলবার্ট ওয়েইনার্ট নির্মিত সেই স্মৃতিস্তম্ভটিকে যুক্তরাষ্ট্রের স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় ন্যাশনাল হিস্টোরিক ল্যান্ডমার্ক হিসেবে ঘোষণা করে।

গ্রানাইটের তৈরি ১৬ ফুট উঁচু এই স্মৃতিস্তম্ভের সামনের দৃশ্যে দেখা যায় একজন পতিত শ্রমিককে ধরে রেখেছে বিচারের প্রতিনিধিত্বকারী এক নারী। এর পাদদেশে লেখা রয়েছে অগাস্ট স্পীজের সেই সর্বশেষ উক্তিটি-

“THE DAY WILL COME WHEN OUR SILENCE WILL BE MORE POWERFUL THAN THE VOICES YOU ARE THROTTLING TODAY”.

স্তম্ভটির পিছনের দৃশ্যে রয়েছে গভর্নর অল্টগেল্ডের একটি ব্রোঞ্জের ফলক যা তার ন্যায়বিচারের প্রতীক।

উল্লেখ্য, শিকাগোর সেই হে-মার্কেট স্কয়ারেও একটি স্মৃতিস্তম্ভ নির্মিত হয়েছে, সেটি নিহত পুলিশ অফিসার মেথিয়াস জে ডিগানের স্মরণে।

বিশ্বব্যাপী মে দিবস

১৮৮৯ সালের ১৪ জুলাই ফ্রান্সে অনুষ্ঠিত আন্তর্জাতিক শ্রমিক সম্মেলনে পয়লা মে শ্রমিক দিবস হিসেবে ঘোষণা করা হয়। পরবর্তী বছর থেকে পয়লা মে বিশ্বব্যাপী পালন হয়ে আসছে ‘মে দিবস’ বা ‘আন্তর্জাতিক শ্রমিক দিবস’।

বাংলাদেশ-সহ বিশ্বের প্রায় ৮০টিরও বেশি দেশে মে দিবস সরকারি ছুটির দিন। এছাড়া বেশ কিছু দেশে বেসরকারিভাবে পালিত হয়।

দুঃখজনক হলেও সত্যি, যুক্তরাষ্ট্রই মে দিবস পালন করে না। একই কথা কানাডার ক্ষেত্রেও। এই দুটি দেশ সেপ্টেম্বর মাসের প্রথম সোমবার শ্রমিক দিবস পালন করে।

লেখক পরিচিতি: কাজী তামান্না তৃষা; কবি, প্রাবন্ধিক ও সাংবাদিক