শেখ হাসিনার জন্মদিন আজ

0
295

বঙ্গবন্ধু কন্যা ও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার ৭৪তম জন্মদিন আজ। গোপালগঞ্জের মধুমতি নদী তীরে টুঙ্গিপাড়ায় ১৯৪৭ সালের ২৮ সেপ্টেম্বর তিনি জন্মগ্রহণ করেন। তিনি স্বাধীন বাংলাদেশের স্থপতি জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ও বঙ্গমাতা বেগম ফজিলাতুন্নেছার বড় সন্তান এবং বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের সভাপতি।

গত কয়েক বছর এইদিনে তিনি জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের অধিবেশনে যোগদানের জন্য যুক্তরাষ্ট্রে অবস্থান করেছেন। তবে এ বছর করোনা মহামারির কারণে দেশেই আছেন।

করোনা পরিস্থিতির কারণে এ বছর স্বাস্থ্যবিধি মেনে আওয়ামী লীগ, যুবলীগ, স্বেচ্ছাসেবক লীগসহ বিভিন্ন রাজনৈতিক ও সামাজিক সংগঠন দলীয় প্রধান শেখ হাসিনার জন্মদিন উদযাপন করবে।

প্রধানমন্ত্রীর জন্মদিন উপলক্ষ্যে আজ দেশের সব মসজিদে দোয়া মাহফিল এবং মন্দির, প্যাগোডা, গির্জাসহ বিভিন্ন ধর্মীয় উপাসনালয়ে বিশেষ প্রার্থনার আয়োজন করা হয়েছে।

জন্মদিন প্রসঙ্গে দলের সাধারণ সম্পাদক এবং সড়ক পরিবহন ও সেতু মন্ত্রী ওবায়দুল কাদের বলেন, শেখ হাসিনার জন্মদিন বাংলাদেশের জন্য একটি ঐতিহাসিক ঘটনা। বঙ্গবন্ধু আমাদের রাজনৈতিক স্বাধীনতার রোল মডেল। শেখ হাসিনা আমাদের উন্নয়ন এবং অর্জনের রোল মডেল। তিনি নিজে যা অর্জন করেছেন, তা নজিরবিহীন। বিশ্ব দরবারে বাংলাদেশকে বিশেষ মর্যাদায় উন্নীত করেছেন। তার জন্মদিন পালন না করলে আমরা জাতির কাছে অকৃতজ্ঞ থেকে যাব।

চতুর্থবারের মত দেশের প্রধানমন্ত্রীর দায়িত্ব পালন করছেন শেখ হাসিনা। তার নেতৃত্বে অর্থনীতির প্রতিটি সূচকে বাংলাদেশ এগিয়ে যাচ্ছে। সন্ত্রাস ও জঙ্গি দমনে তিনি বিশ্বনেতাদের প্রশংসা কুড়িয়েছেন। মিয়ানমারে জাতিগত সহিংসতায় পালিয়ে আসা রোহিঙ্গা মুসলিমদের আশ্রয় দিয়ে সারা বিশ্বে প্রশংসিত হয়েছেন। বাংলাদেশকে নিয়ে গেছেন অনন্য উচ্চতায়।

শেখ হাসিনার নেতৃত্বে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি, খাদ্যে স্বনির্ভরতা, নারীর ক্ষমতায়ন, কৃষি, শিক্ষা, স্বাস্থ্য, গ্রামীণ অবকাঠামো, যোগাযোগ, জ্বালানী ও বিদ্যুৎ, বাণিজ্য, আইসিটি এবং এসএমই খাতে এসেছে ব্যাপক সাফল্য।

যুদ্ধাপরাধীদের বিচার, জঙ্গিবাদ প্রতিরোধ, বঙ্গবন্ধুর আত্মস্বীকৃত খুনিদের বিচার, পার্বত্য চট্টগ্রামের ঐতিহাসিক শান্তি চুক্তি সম্পাদন, একুশে ফেব্রুয়ারি আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবসের স্বীকৃতিসহ জাতীয় জীবনের বহুক্ষেত্রে অভাবনীয় সাফল্য অর্জন করেছেন তিনি।

প্রধানমন্ত্রীর গতিশীল নেতৃত্বে করোনাকালেও দেশের প্রবৃদ্ধি এশিয়ায় প্রায় সবদেশের ওপরে। গত সাড়ে ৬ মাসে করোনা মোকাবেলায় তার বলিষ্ঠ নেতৃত্বে এই মহামারী নিয়ন্ত্রণ এবং অর্থনীতির চাকা সচল থেকেছে।

তথ্যমন্ত্রী ও আওয়ামী লীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক ডক্টর হাছান মাহমুদ বলেছেন, বঙ্গবন্ধু কন্যা ও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার গতিশীল নেতৃত্বের কারণেই করোনা মহামারীর মধ্যেও দেশের অর্থনীতির চাকা সচল রয়েছে। তাই আমাদের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি এশিয়ার প্রায় সব দেশের ওপরে।

তিনি বলেন, প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সঠিক নেতৃত্ব, সময়োচিত পদক্ষেপ, মানুষের জন্য আর্থিক সহায়তা, খাদ্য সহায়তা, ব্যবসাখাতে অর্থনৈতিক প্রণোদনা ঘোষণা এবং তা বাস্তবায়নের কারণে দেশে সাড়ে ৬ মাসে অনাহারে একজন মানুষেরও মৃত্যু হয়নি, খাদ্যের জন্য কখনো কোথাও হাহাকার হয়নি।

বাংলাদেশের ধারাবাহিক উন্নয়নের কারণে শেখ হাসিনা পেয়েছেন আন্তর্জাতিক অনেক সম্মাননা ও পদক। তিনি এ পর্যন্ত ৩৯টি আন্তর্জাতিক পুরস্কার লাভ করেছেন। টিকাদান কর্মসূচিতে বাংলাদেশের সফলতা জন্য গত বছরের (২০১৯) ২৩ সেপ্টেম্বর প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে ‘ভ্যাকসিন হিরো’ পুরস্কার দেয় গ্লোবাল অ্যালায়েন্স ফর ভ্যাকসিনেশন এবং ইমিউনাইজেশন (জিএভিআই)। একই মাসে শেখ হাসিনাকে ডক্টর কালাম স্মৃতি ইন্টারন্যাশনাল এক্সিলেন্স অ্যাওয়ার্ড দেয়া হয়।

এর আগে, শান্তি প্রতিষ্ঠা, গণতন্ত্র সমুন্নত ও আর্থ-সামাজিক উন্নয়নে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখায় প্রধানমন্ত্রীকে বিভিন্ন পর্যায়ের পদক প্রদান করে বিশ্বের বিভিন্ন স্বনামধন্য বিশ্ববিদ্যালয় ও ইনস্টিটিউট।

রোহিঙ্গা ইস্যুতে দূরদর্শী নেতৃত্ব এবং রোহিঙ্গাদের আশ্রয়দানে দায়িত্বশীল নীতি ও মানবিকতার জন্য আইপিএস ইন্টারন্যাশনাল অ্যাচিভমেন্ট অ্যাওয়ার্ড এবং ২০১৮ স্পেশাল ডিসটিংশন অ্যাওয়ার্ড ফর লিডারশিপ গ্রহণ করেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা।

ডিজিটাল বাংলাদেশ বিনির্মাণের প্রবক্তা স্বপ্নদর্শী এই নেত্রী ১৯৮১ সালে আওয়ামী লীগের সভাপতির দায়িত্ব গ্রহণ করেন। স্বৈরাচারবিরোধী দীর্ঘ আন্দোলনে নেতৃত্ব দেয়ার পাশাপাশি দলকে সুসংগঠিত করেন। সাধারণ নির্বাচনে সংখ্যা গরিষ্ঠতা অর্জনের মধ্য দিয়ে ১৯৯৬ সালে প্রথম, ২০০৮ সালে দ্বিতীয় এবং ২০১৪ সালে তৃতীয় এবং ২০১৮ সালে চতুর্থ বারের মত প্রধানমন্ত্রী হন।

দাদা শেখ লুৎফর রহমান ও দাদি সাহেরা খাতুনের অতি আদরের নাতনি শেখ হাসিনার শৈশব-কৈশোর কেটেছে টুঙ্গিপাড়ায়। শেখ কামাল, শেখ জামাল, শেখ রেহানা এবং শেখ রাসেলসহ তারা পাঁচ ভাই-বোন। বর্তমানে শেখ হাসিনা ও শেখ রেহানা ছাড়া কেউই জীবিত নেই। ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্টের কালরাতে পিতা বঙ্গবন্ধু এবং মাতা ফজিলাতুন্নেছাসহ সবাই ঘাতকদের নির্মম বুলেটে নিহত হন।

শেখ হাসিনার শিক্ষাজীবন শুরু হয়েছিল টুঙ্গিপাড়ার এক পাঠশালায়। ১৯৫৪ সালের নির্বাচনে বঙ্গবন্ধু প্রাদেশিক পরিষদের সদস্য নির্বাচিত হয়ে পরিবারকে ঢাকায় নিয়ে আসেন। তখন তারা ঢাকার রজনী বোস লেনে ভাড়া বাসায় ওঠেন।

বঙ্গবন্ধু যুক্তফ্রন্ট মন্ত্রিসভার সদস্য হলে সপরিবারে মিন্টু রোডের ৩ নম্বর বাসায় বসবাস শুরু করেন। এ সময় শেখ হাসিনাকে টিকাটুলির নারী শিক্ষা মন্দিরে (বর্তমানে এটি শেরে বাংলা গার্লস স্কুল এন্ড কলেজ) ভর্তি করা হয়।

তিনি ১৯৬৫ সালে আজিমপুর বালিকা বিদ্যালয় থেকে মাধ্যমিক, ১৯৬৭ সালে ইন্টারমিডিয়েট গার্লস কলেজ (বর্তমান বেগম বদরুন্নেসা সরকারি মহিলা কলেজ) থেকে উচ্চ মাধ্যমিক পরীক্ষায় পাস করেন। ওই বছরেই তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে বাংলা ভাষা ও সাহিত্যে স্নাতক (সম্মান) শ্রেণিতে ভর্তি হন এবং ১৯৭৩ সালে স্নাতক ডিগ্রি লাভ করেন।

শেখ হাসিনা ইন্টারমিডিয়েট গার্লস কলেজ ছাত্র সংসদের সহ-সভাপতি নির্বাচিত হন। তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্রলীগের সদস্য এবং রোকেয়া হল শাখার সাধারণ সম্পাদক ছিলেন। ছাত্রলীগের নেত্রী হিসেবে তিনি আইয়ুব বিরোধী আন্দোলন এবং ৬ দফা আন্দোলনে সক্রিয়ভাবে অংশ নেন।

১৯৬৮ সালে পরমাণু বিজ্ঞানী ডক্টর ওয়াজেদ মিয়ার সাথে শেখ হাসিনার বিয়ে হয়। ১৯৭১ সালের ২৫ মার্চ রাতে বঙ্গবন্ধুকে গ্রেফতার করে পাকিস্তানের করাচিতে নিয়ে যাওয়ার পর গোটা পরিবারকে ঢাকায় ভিন্ন এক বাড়িতে গৃহবন্দী করে রাখা হয়। ১৯৭১ সালের ২৭ জুলাই শেখ হাসিনা গৃহবন্দী থাকা অবস্থায় প্রথম সন্তান সজীব ওয়াজেদ জয়-এর জন্ম হয়। ১৯৭২ সালের ৯ ডিসেম্বর সায়মা ওয়াজেদ পুতুলের জন্ম হয়।

বঙ্গবন্ধু ১৯৭৫ সালে সপরিবারে নিহত হওয়ার আগে ছোট বোন শেখ রেহানাসহ শেখ হাসিনা ইউরোপ যান। সেখানেই তিনি সপরিবারে বঙ্গবন্ধুর নিহত হওয়ার খবর পান। তাৎক্ষণিকভাবে দেশে ফেরার কোনো পরিবেশ না থাকায় তিনি ইউরোপ ছেড়ে স্বামী-সন্তানসহ ভারতে রাজনৈতিক আশ্রয় নেন।

১৯৮১ সালের ১৩ থেকে ১৫ ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠিত আওয়ামী লীগের দ্বি-বার্ষিক সম্মেলনে তাকে দলের সভাপতি নির্বাচিত করা হয়। আর ওই বছরেরই ১৭ মে ৬ বছরের প্রবাস জীবনের অবসান ঘটিয়ে মাতৃভূমিতে ফিরে আসেন।

তিনি ১৯৮৩ থেকে ১৯৯০ সাল পর্যন্ত স্বৈরাচারবিরোধী গণআন্দোলনে নেতৃত্ব দেন। আওয়ামী লীগ ১৯৯৬ সালের সাধারণ নির্বাচনে সংখ্যাগরিষ্ঠতা পেয়ে দীর্ঘ ২১ বছর পর সরকার গঠন করে। সে বছরের ২৩ জুন প্রথমবারের মত দেশের প্রধানমন্ত্রীর দায়িত্ব গ্রহণ করেন শেখ হাসিনা।

২০০৪ সালের ২১ আগস্ট বঙ্গবন্ধু অ্যাভিনিউ-তে আওয়ামী লীগের শান্তি সমাবেশে গ্রেনেড নিক্ষেপ করে তাকে হত্যার ষড়যন্ত্র করা হয়। ওই হামলায় তিনি বেঁচে গেলেও ২৪ জন নেতা-কর্মী নিহত এবং অন্তত ৫শ’ জন আহত হন।

২০০৮ সালের ২৯ ডিসেম্বর অনুষ্ঠিত সংসদ নির্বাচনে আওয়ামী লীগ দুই-তৃতীয়াংশের বেশি আসন নিয়ে বিজয় অর্জন করে। এই বিজয়ের মধ্যদিয়ে শেখ হাসিনা দ্বিতীয় বারের মতো বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী নির্বাচিত হন। ২০১৪ সালের ৫ জানুয়ারি তৃতীয়বার এবং ২০১৮ সালের ৩০ ডিসেম্বরের নির্বাচনে বিজয়ী হয়ে চতুর্থবারের মত বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রীর দায়িত্ব পালন করছেন।

শিল্প, সংস্কৃতি ও সাহিত্য অন্তপ্রাণ শেখ হাসিনা লেখালেখিও করেন। তার লেখা এবং সম্পাদিত বইয়ের সংখ্যা ৩০টিরও বেশি। প্রকাশিত অন্যতম বই: শেখ মুজিব আমার পিতা, সাদা কালো, ওরা টোকাই কেন, বাংলাদেশে স্বৈরতন্ত্রের জন্ম, দারিদ্র্য দূরীকরণ, আমাদের ছোট রাসেল সোনা, আমার স্বপ্ন আমার সংগ্রাম, সামরিকতন্ত্র বনাম গণতন্ত্র, আন্তর্জাতিক সম্পর্ক উন্নয়ন, বিপন্ন গণতন্ত্র, সহে না মানবতার অবমাননা, আমরা জনগণের কথা বলতে এসেছি, সবুজ মাঠ পেরিয়ে, নির্বাচিত প্রবন্ধ, দারিদ্র দূরীকরণ: কিছু চিন্তাভাবনা, বিপন্ন গণতন্ত্র লাঞ্চিত মানবতা, লিভিং ইন টিয়ারস (ইংরেজি), বৃহৎ জনগোষ্ঠীর জন্য উন্নয়ন, শেখ হাসিনা রচনাসমগ্র (২ খণ্ড), বিশ্ব প্রামাণ্য ঐতিহ্যে বঙ্গবন্ধুর ভাষণ, আমরা জনগণের কথা বলতে এসেছি ইত্যাদি।