৬ দফা বঙ্গবন্ধুর চিন্তার ফসল

ক্যুইজ প্রতিযোগিতার পুরস্কার প্রদান অনুষ্ঠানে প্রধানমন্ত্রী

0
481
ফাইল ছবি

প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেছেন, ঐতিহাসিক ছয় দফা ছিল জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের একান্ত চিন্তার ফসল। তিনি বলেন, অনেকেই ছয় দফা দাবি নিয়ে অনেক কথা বলেন। কিন্তু, আমি ব্যক্তিগতভাবে জানি যে এটা বঙ্গবন্ধুর একান্ত চিন্তার ফসল।

বুধবার ঐতিহাসিক ছয় দফা দিবস উপলক্ষে অনলাইন ক্যুইজ প্রতিযোগিতার পুরষ্কার বিতরণী অনুষ্ঠানে তিনি এ কথা বলেন। আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা ইনস্টিটিউটে বঙ্গবন্ধুর জন্মশত বার্ষিকী উদযাপন বিষয়ক জাতীয় বাস্তবায়ন কমিটি এই পুরষ্কার বিতরণী অনুষ্ঠানের আয়োজন করে। প্রধানমন্ত্রী ভিডিও কনফারেন্সের মাধ্যমে এতে যুক্ত হন।

অনুষ্ঠানে প্রধানমন্ত্রী স্মৃতিচারণ করে বলেন, মোহম্মাদ হানিফ (ঢাকা সিটি কর্পোরেশনের সাবেক মেয়র) এই তথ্য ভালভাবে জানতেন। কারণ, তিনি আলফা ইনস্যুরেন্স কোম্পানিতে বঙ্গবন্ধুর ব্যক্তিগত সহকারি ছিলেন এবং তিনি ছয় দফা দাবি টাইপ করেছিলেন। বঙ্গবন্ধু ১৯৬০ সালে দলীয় নেতা-কর্মীদের সাথে যোগাযোগ রক্ষা করতে এই কোম্পানিতে যোগ দেন।

শেখ হাসিনা বলেন, বঙ্গবন্ধু সব সময় (ছয় দফা দাবি সম্পর্কে) তার চিন্তা ভাবনার কথা লিখে রাখতেন এবং এগুলোও তিনি তার সহকারি (মোহম্মদ হানিফ)-কে টাইপ করে রাখতে বলতেন। একমাত্র হানিফই জানতেন যে, ছয় দফা আর কারও নয়, একমাত্র বঙ্গবন্ধুর একান্ত চিন্তাধারার ফসল।

ছয় দফা দাবির পটভূমি সম্পর্কে তিনি বলেন, পাকিস্তানের কেন্দ্রীয় সরকারের কাছে পূর্ব বাংলা বা তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানের জনগণের নিরাপত্তার কোনই গুরুত্ব ছিল না, তাই ১৯৬৫ সালে পাক-ভারত যুদ্ধের সময় এ অঞ্চলের জনগণ সম্পূর্ণ অরক্ষিত ছিল। পাক-ভারত যুদ্ধের সময় আমরা সম্পূর্ণ অরক্ষিত ছিলাম। সে কারণেই, বঙ্গবন্ধু দূরদর্শীতার সাথে ছয় দফা দাবি ঘোষণার সিদ্ধান্ত নেন।

সব ক্ষেত্রে বিশেষত বেসামরিক ও সামরিক চাকরিতে পূর্ব ও পশ্চিম পাকিস্তানের মধ্যে বৈষম্যের চিত্র তুলে ধরে প্রধানমন্ত্রী বলেন, রাজস্বের বড় অংশই বাংলাদেশ থেকে আসতো। কিন্তু এর সিংহভাগই পশ্চিম পাকিস্তানের উন্নয়নে ব্যয় হতো।

প্রধানমন্ত্রী বলেন, বঙ্গবন্ধু এই বিরাট বৈষম্য ও শোষণ-বঞ্চনার ইস্যুটি তুলে ধরেন এবং এর বিরুদ্ধে সংগ্রাম চালিয়ে যান। আর তার সংগ্রামের পথ ধরেই আমরা স্বাধীনতা অর্জন করি।

শেখ হাসিনা বলেন, বঙ্গবন্ধু ১৯৬৬ সালের ৫ ফেব্রুয়ারি লাহোর সম্মেলনে ছয় দফা দাবি উত্থাপনের চেষ্টা করেন। কিন্তু তাকে তা করতে বাধা দেয়া হয়।

তিনি আরও বলেন, বঙ্গবন্ধু ১৯৬৬ সালের ১১ ফেব্রুয়ারি ঢাকায় ফিরে আসেন এবং বিমানবন্দরেই সাংবাদিকদের কাছে সংক্ষেপে ছয় দফা দাবি তুলে ধরেন।

প্রধানমন্ত্রী বলেন, ছয় দফা দাবিতে পাকিস্তানের প্রতিটি প্রদেশকে স্বায়ত্তশাসন দেয়ার প্রস্তাব রাখা হয়। আওয়ামী লীগের কার্যনির্বাহী কমিটি ও দলের জাতীয় সম্মেলনে ছয় দফা গৃহীত হয়েছিল।

শেখ হাসিনা বলেন, বঙ্গবন্ধু পরে দেশব্যাপী ছয় দফা দাবি প্রচারের পদক্ষেপ নেন এবং একের পর এক জনসভা করতে থাকেন।

এ প্রসঙ্গে প্রধানমন্ত্রী বলেন, বঙ্গবন্ধু যেখানেই ছয় দফার পক্ষে সভা করতে যেতেন সেখানেই তার বিরুদ্ধে মামলা দেয়া হত। বারবার তাকে গ্রেফতার করা হয় এবং প্রতিটি জেলায় তার বিরুদ্ধে মামলা দায়ের করা হয়।

শেখ হাসিনা বলেন, নারায়ণগঞ্জের আদমজীনগরে ছয় দফা দাবির উপর সব শেষ সভা করে ঢাকায় ফিরে আসার পরই পুলিশ বঙ্গবন্ধুকে ধানমণ্ডির বাসভবন থেকে গ্রেফতার করে।

তিনি বলেন, শুধু বঙ্গবন্ধুকেই নয়, বহু নেতাকর্মীকে পুলিশ তুলে নিয়ে যায়। এই ঘটনার প্রতিবাদে জনগণ দেশব্যাপী ব্যাপক আন্দোলন শুরু করে।

প্রধানমন্ত্রী বলেন, বঙ্গবন্ধু ঐতিহাসিক ছয়দফা দাবি ঘোষণা করেছিলেন যা বাঙালির সামনে তাদের স্বাধীনতার দাবি হিসাবে হাজির হয়েছিল এবং তারা এটিকে বেঁচে থাকার অধিকার হিসাবে গ্রহণ করেছে।

তিনি বলেন, এটি পৃথিবীতে একটি বিরল উদাহরণ যে জনগণ এইভাবে একটি দাবিকে (ছয় দফা দাবি) গ্রহণ করেছিল এবং এটি বাস্তবায়নের জন্য রক্ত দিয়েছিল। এটি কেবল বাঙালির পক্ষেই সম্ভব।’ তিনি বলেন, পাকিস্তানি শাসকদের হাত থেকে দেশকে মুক্ত করতে ছয়দফা দাবি পর্যায়ক্রমে এক দফা দাবিতে পরিণত হয়েছিল।

প্রধানমন্ত্রী বলেন, আইয়ুব খান ১৯৬৯ সালের একুশে ফেব্রুয়ারি গণআন্দোলনের মুখে মামলা প্রত্যাহার করতে বাধ্য হন এবং বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ১৯৬৯ সালের ২২ ফেব্রুয়ারি কারাগার থেকে মুক্তি পান।

শেখ হাসিনা বলেন, ছয়দফা দাবি ঘোষণার কারণে বঙ্গবন্ধু এবং আওয়ামী লীগের শীর্ষস্থানীয় নেতাদের গ্রেপ্তারের পর তার মা শেখ ফজিলাতুন্নেছা মুজিব এই দাবিকে কেন্দ্র করে আন্দোলনের পক্ষে জনমত গঠনে বিরাট ভূমিকা রাখেন। প্রধানমন্ত্রী স্মরণ করেন, ‘আমার মা সবসময় জানতেন যে আমার বাবা কী চান এবং সে সম্পর্কে তিনি খুব সচেতন থাকতেন।

তিনি বলেন, কারাগারে বঙ্গবন্ধুর সঙ্গে দেখা করতে গিয়ে তার মা (ফজিলাতুন্নেছা) বঙ্গবন্ধুর কাছ থেকে যেসব নির্দেশনা পেতেন তা দলীয় নেতা-কর্মী ও ছাত্র সমাজের কাছে পৌঁছে দিতেন। বঙ্গবন্ধু যখন উর্দুর পরিবর্তে বাংলাকে রাষ্ট্রভাষা হিসাবে প্রতিষ্ঠার আন্দোলন গড়ে তোলেন যা শেষ পর্যন্ত পর্যায়ক্রমে দেশের স্বাধীনতা অর্জনের দিকে চালিত করে তখন তার উপর্যুপরি গ্রেপ্তারের কথাও স্মরণ করেন শেখ হাসিনা।

প্রধানমন্ত্রী বলেন, ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট জাতির পিতা এবং তার পরিবারের বেশিরভাগ সদস্যকে হত্যার মধ্য দিয়ে দেশের অগ্রযাত্রা বন্ধ হয়ে যায়।

তিনি বলেন, ‘আমাদের জাতির পিতার আদর্শ অনুসরণ করে দারিদ্র্য ও ক্ষুধামুক্ত একটি উন্নত ও সমৃদ্ধ দেশ গড়তে এগিয়ে যেতে হবে।

তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি প্রতিমন্ত্রী জুনাইদ আহমেদ পলক ও বঙ্গবন্ধুর জন্ম শতবার্ষিকী উদযাপন জাতীয় বাস্তবায়ন কমিটি’র প্রধান সমন্বয়ক ডক্টর কামাল আবদুল নাসের চৌধুরী অনুষ্ঠানে স্বাগত বক্তব্য রাখেন।

অধ্যাপক ডক্টর রফিকুল ইসলাম অনুষ্ঠানে অংশগ্রহণকারীদের ধন্যবাদ জানান। তিনি প্রধানমন্ত্রীর পক্ষ থেকে প্রতিযোগিতায় বিজয়ীদের মাঝে প্রধানমন্ত্রীর স্বাক্ষরিত চেক ও সনদ প্রদান করেন।
সারাদেশের ৩৫টি জেলা প্রশাসনের কার্যালয় থেকে ১০০ জন বিজয়ীসহ প্রতিযোগীরা অনলাইনে অনুষ্ঠানে সংযুক্ত ছিলেন।

প্রতিযোগিতায় এক লাখ ৯ হাজার ৯২৯ প্রতিযোগী অংশ নেন। অংশগ্রহণকারীদের মধ্যে ক্যুইজ প্রতিযোগিতায় প্রথম হওয়া ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের জনপ্রশাসন বিভাগের ছাত্র ইমতিয়াজ পাশা ও খুলনা রেলওয়ে গার্লস স্কুলের শিক্ষিকা খুকু রানী প্রতিযোগীদের পক্ষ থেকে তাদের অভিজ্ঞতা বর্ণনা করেন।

অনুষ্ঠানে ‘মুজিব বর্ষের’ থিম সং এবং জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ঘোষিত ছয় দফা দাবির উপর একটি প্রামাণ্যচিত্র প্রদর্শিত হয়।